ময়মনসিংহের ভালুকায় কাদিগড় জাতীয় উদ্যানের এক কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ করাতকল। এ উপজেলার বাটাজোর বাজারে ৮-১০টিসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠা শতাধিক করাতকলে অবাধে চেরাই করা হচ্ছে বিশাল বিশাল শাল-গজারি ও আকাশমণি গাছ। একটি সঙ্ঘবদ্ধ গাছ পাচারকারী দল রাতের আঁধারে সরকারি বনের গাছ কেটে উজাড় করে দিচ্ছে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ও হবিরবাড়ি এলাকার ১১ গড় নামে গজারি বন। জানা গেছে, বনবিভাগের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে এসব লাইসেন্সবিহীন করাতকলগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সংশোধন আইনের আওতায় বিগত ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর এক আদেশবলে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার কাচিনা ইউনিয়নের পালগাঁও এলাকায় ৮৫০ একর ভূমির সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে কাদিগড় জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এ উদ্যানে রয়েছে পুরনো শাল-গজারি গাছের এক অপরূপ সবুজের সমারোহ। জাতীয় উদ্যান হিসেবে এলাকাটি চিহ্নিত হওয়ার পর তা সংরক্ষণে সরকারিভাবে কাজ শুরু হয়।
কিন্তু জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে একটি বিশেষ চক্র উদ্যানের গাছ কাটা শুরু করে। চক্রটি রাতে উদ্যান এলাকা থেকে গজারি গাছ কেটে ঘোড়ার গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে পাশের বাটাজোর বাজার ও আশপাশের বিভিন্ন করাতকল মালিকদের কাছে পৌঁছে দেয়।
বনআইনে বন এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও কাদিগড় বনাঞ্চল থেকে মাত্র এক-দেড় কিলোমিটার দূরে কাচিনা বাজার ও বাটাজোর বাজার এলাকায় ২০টি লাইসেন্সবিহীন করাতকল রয়েছে। এসব করাতকলে দিনে-দুপুরে উদ্যানের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ চেরাই করা হয়। করাতকলে প্রকাশ্যেই চেরাই করা হচ্ছে বনের গাছ। শুধু কাচিনা আর বাটাজোরই নয়, উদ্যানের মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে তামাট বাজারেও রয়েছে শাহীন মেম্বারের মালিকানাধীন করাতকলসহ তিনটি করাতকলে। এসব করাতকলে রাত-দিন গাছ চেরাই করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক করাতকল মালিক জানান, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই আমরা বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করি। প্রতিটি করাতকল পরিচালনার জন্য তাদেরকে প্রতি মাসে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকি। এতে করে আমাদের কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন পড়ে না। তিনি আরো জানান, লাইসেন্স নিতে গেছে যেসব কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়, সেসব জোগাড় করতে ঝামেলা আরো বেড়ে যায়। বন বিভাগে কিছু অনৈতিক সুবিধা দিলে লাইসেন্স ছাড়াই ঝামেলাহীনভাবে কাঠ চেরাইয়ের কাজ করা যায়। তিনি জানান, এলাকার প্রত্যেকটি স’মিল মালিকেরই নিজস্ব ফার্নিচারের দোকান রয়েছে। তাই চেলাইকৃত এসব চোরাই কাঠ সহজেই আশপাশ এলাকায় বিক্রি এবং নিজেদের ফার্নিচারের দোকানে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
উপজেলার বাটাজোর বাজারে অবস্থিত দু’টি অবৈধ করাতকলের মালিক নয়ন মিয়া জানান, প্রতি মাসে তারা সবগুলো মিল থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা তোলেন এবং সেই টাকা মাসোহারা হিসেবে স্থানীয় বনবিট অফিসে পৌঁছে দেয়া হয়। এতে তাদের কাঠ চেরাইয়ের কার্যক্রম চালাতে আর কোনো অসুবিধা হয় না।
এ ব্যাপারে কাদিগড় বিট কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন করাতকলপ্রতি মাসোহারা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে নয়া দিগন্তকে জানান, এখন বনায়নের সময় এবং বিভিন্ন জায়গায় গাছের চারা রোপণ নিয়ে ব্যস্ত আছি। করাতকল নিয়ে চিন্তা করার সময় নেই তাদের। হবিরবাড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ জানান, জাতীয় উদ্যানের আশপাশসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা করাতকল মালিকতের বিরুদ্ধে অচিরেই অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।