চলতি মৌসুমে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলে কেওড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে ফলে ভরে গেছে প্রতিটি গাছ। কেওড়া আগে সুন্দরবনের গাছ হলেও এখন উপকূলীয় খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার নদীর চরভরাটি জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে অন্যান্য প্রজাতির গাছের সাথে কেওড়া গাছের চারা লাগানো হচ্ছে।
সুন্দরবনসংলগ্ন পাইকগাছা উপজেলার শিবসা, ভদ্রা, মিনহাজ, কুড়ুলিয়া ও কপোতাক্ষ নদ-নদীর চরভরাটি জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে গত কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রচুর পরিমাণে কেওড়া গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। কেওড়া দ্রুত বর্ধনশীল একটি গাছ। এর গড় উচ্চতা ২০ মিটার। এ গাছের পাতা চিকন, ফল আকারে ছোট ও গোলাকার। কেওড়া সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ।
সুন্দরবনে নদী ও খালের তীর ও চরে এ গাছ বেশি জন্মায়। এর কাঠ দিয়ে ঘরের বেড়া, দরজা, জানালা তৈরি ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর পাতা সুন্দরবনের তৃণভোজি প্রাণীর প্রধান খাদ্য। ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও ওষুধি গুণাগুণ রয়েছে। কেওড়া গাছ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও ক্ষয়ক্ষতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। বর্তমানে উপকূলীয় এলাকার চরভরাটি জমিতে ব্যাপক হারে কেওড়া গাছ লাগানো হচ্ছে।
তবে বাণিজ্যিকভাবে কেওড়া চাষে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার অর্থনীতির জন্য অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। কেওড়া চাষ এ অঞ্চলের দারিদ্র্যবিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে বলেও অনেকেই মনে করেন।
এ ছাড়া এলাকার বিভিন্ন স্লুইস গেটের ধারে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বড় বড় কেওড়া গাছ রয়েছে। কেওড়া বর্ধনশীল হওয়ায় গাছে দ্রুত ফল ধরে। ফাগুনে ফুল ফোটে, চৈত্র-বৈশাখে ফল ধরে, আর আষাঢ়-শ্রাবণ ও ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। এক একটা গাছে এত বেশি ফল ধরে যে ফলের জন্য গাছের পাতা দেখা যায় না।
এ সময় এলাকার হাটবাজারে কেওড়া ফল ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়ে থাকে। চিংড়ি দিয়ে কেওড়ার টক রান্না (খাট্টা) খুব সুস্বাদু হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, কেওড়া উপকূলীয় অঞ্চলের অতিপরিচিত একটি ফল। ফলটির রয়েছে প্রচুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। কেওড়ায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। কেওড়া ফল রক্তে কোলেস্টেরল ও শরীরের চর্বি কমায়। এতে কিছু এনজাইম আছে যা শরীরের হজম শক্তি বাড়ায়। রয়েছে ওষুধি গুণাগুণও। এই ফল চুলকানি ও পাঁচড়ার রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে থাকে। এটি পাকস্থলীর অ্যাসিডিটি কমায়। কেওড়া গাছ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এক বন কর্মকর্তা বলেন, কেওড়া চাষ অত্যন্ত লাভজনক। এ গাছ দ্রত বর্ধনশীল হওয়ায় ৩/৪ বছরের মধ্যে ফল ধরে এবং প্রথম বারই ২০ থেকে ১ মণ পর্যন্ত ফল হয়। উপকূলীয় চরভরাটি জমিতে যদি বাণিজ্যিকভাবে কেওড়া চাষ করা হয় তাহলে একদিকে বাঁধ ও পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং অন্য দিকে এর ফল ও কাঠ বাজারে বিক্রি করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব। এমনকি কেওড়া বাগানে মধু উৎপাদন করেও প্রচুর টাকা আয় করা সম্ভব। কেওড়া চাষে তেমন কোনো পরিচর্যা লাগে না এবং লবণ সহিষ্ণু হওয়ায় এর উৎপাদন খরচও অনেক কম।



