শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাষণ পথ বন্ধ হওয়ায় অবিরাম বৃষ্টিতে রংপুর মহানগরীর বুক চিরে যাওয়া খাল দু’টির দু’পাশসহ নিম্নাঞ্চলের ৩৩ পাড়ায় তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। এদিকে বর্ষণে বিপৎসীমার কাছাকাছি হওয়ায় আবারো চোখ রাঙ্গাচ্ছে তিস্তার পানি।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান জানিয়েছেন, রোববার ( ২৪ সেপ্টেম্বর) সনধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রংপুরে ২৩৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এছাড়া আরো বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নগরীর প্রধান প্রধান এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা না হলেও নগরীর বুক চিরে চলে যাওয়া শ্যামা সুন্দরী খালে ১৬ কিলোমিটার এবং কেডি খালের এলাকার দু’পাশসহ নগরীর নিমাঞ্চলগুলোর অন্তত ৩৩ পাড়ায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পনি ঢুকে পড়েছে বাসাবাড়ি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও। কোথাও হাঁটু কোথাও কোমড় পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট।

ভুক্তভোগিরা জানিয়েছেন, শ্যামাসুন্দরী খাল ভরাট হওয়ার কারণে পানি বের হতে না পাড়ায় এই জলাবদ্ধতা। এতে ভোগান্তি বেড়েছে বহুগুন।

সরেজমিন দেখা গেছে, নগরীর নুরপুর, কুকরুল, নীলকণ্ঠ, পান্ডারদীঘি, ছোটাপীর, খটখটিয়া, নিউ জুম্মাপাড়া, শালবন মিস্ত্রিপাড়া, বাহারকাছনা, কামালকাছনা, এরশাদনগর, নাচনিয়া, পুর্ব শালবন শান্তিধারা, খেরবাড়ি, মাহিগঞ্জ, নগরমীরগঞ্জ, রঘু, হনুমানতলা ইসলামপুর, শেখপাড়া, ফতেহপুর, দর্শনা, নুরপুর, মোহাম্মদপুর, রাবর্টসন্সগঞ্জ, বাবুপাড়া, তাজহাট, মুলাটোল, মুন্সিপাড়া, কেরানীপাড়া, গুড়াতিপাড়া, ধর্মদাস, শেখপাড়া, পালপাড়া, গোমস্তাপাড়া, সাতগাড়া মিস্ত্রিপাড়া, খলিফাপাড়া, ভগিবালাপাড়া, রামপুরা, পাবর্তীপুর, নিসবেতগঞ্জ, যুগিটারী, পাঠানপাড়া, দেওডোবা, ভুরারঘাট, বানিয়াপাড়া ও খামারপাড়াসহ ৩৩টি নিম্নাঞ্চলের পাড়ামহল্লার মানুষ।

আরো বৃষ্টি হলে নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে সময় লাগবে। এই অবস্থায় নিম্নায়ের মানুষের সবচেয়ে দুর্দিন। তারা কাজে যেতে পারছেন না। সিটি করপোরেশন থেকে পানি নামাতে টিম কাজ করছে। তারা বিভিন্ন ব্রিজ-কালভার্ট ও ড্রেনের মুখ পরিষ্কার করছে। তবুও ধীরগতিতে নামছে পানি। কারণ শ্যামাসুন্দরী খাল ও কেডি ক্যানেল ভরাট হয়ে যাওয়া এবং ঘাঘটের পানির লেভেলে বেশি হওয়ায় পানি যেতে পারছে না।

ঢাকায় অবস্থানরত রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা জানিয়ছেন, আমি বার বার বলছি। শ্যামাসুন্দরী খাল খনন করতে হবে। কারণ সামান্য বৃষ্টিতেই শ্যামাসুন্দরী খাল উপচে যায়। ড্রেনের মুখগুলো শ্যামাসুন্দরী দেয়া হয়েছে। কিন্তু খালটি পানি ধরতে পারছে না। একারণে উপচে খালের দুই পাশে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। আমি বার বার সরকারের কাছে দাবি করছি শ্যামাসুন্দরী খাল ও কেডি খাল খননের।

তিনি বলেন, নগরীর ভেতরে সুন্দর ড্রেজে ব্যবস্থাপনার কারণে কোথায় পানি জমতে পারেনি। বর্ধিত এলাকাগুলো ড্রেনেজ ব্যবস্থায় আনতে পারলে এবং শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল খনন করতে পারলে এই জলাবদ্ধতা থাকবে না, যতই বৃষ্টি হোক।

২০২০ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ায় রংপুর মহানগরীর বাণিজ্যিক এলাকাসহ ১৪৮টি পাড়া মহল্লা, প্রধানসড়কসহ সকল সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। ১১৩ বস্তিসহ বর্ধিত ২১৮টি ওয়ার্ডের মানুষ আছেন চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন। ওই বৃষ্টি ছিল রংপুরের ইতিহাসে ১০০ বছরের সর্বোচ্চ রেকর্ড।

রংপুর আবহওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ ও ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুরে ৩০৫ দশমিক ৪, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৪২৪, ডিমলায় ১৯১ দশমিক ১, কুড়িগ্রামে ৫৯, পঞ্চগড়ে ১৫২ এবং লালমনিরহাটে ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানিয়েছেন, অবিরাম বর্ষণ এবং উজানের ঢলের কারণে রোববার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তার পানি ব্যারাজ পয়েন্টে বিপৎসীমাার ৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বর্ষণ অব্যাহত থাকলে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেছেন, ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্যামা সুন্দরী খাল ও কেডি ক্যানেল ভরাট, সংকোচন ও দখল হয়ে যাওয়ায় পানি নামতে পারছে না নগরী থেকে। এজন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে উৎস ও শেষ চিহ্নিত করে সাজাতে হবে। তা-না হলে বৃষ্টির জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে পারবে না নগরবাসী।