যশোরের চৌগাছায় রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। কৃষকরা কীটনাশকের পরিমাণ ও মাত্রা না জেনে নিজেদের ইচ্ছে মতো কীটনাশক ব্যবহার করছেন এবং কীটনাশক স্প্রে করার সময় তারা কোনো প্রকার শারীরিক সুরক্ষাও ব্যবহার করছেন না। কীটনাশক ব্যবহারে তাদের এই অজ্ঞতার কারণে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শুধু কৃষকরাই নন, কৃষকদের এই অসচেতনতার কারণে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী এবং পরিবেশও বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। অনেক কৃষকই চর্মরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

এ উপজেলায় সারা বছর জুড়েই বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হয়। শিম, করোলা, পটোল, টমেটা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা, বেগুন, মরিচসহ সবজিক্ষেতগুলোতে রোগ-বালাই ও পোকামাকড় দমন করতে কৃষকরা বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক স্প্রে করে থাকেন। কিন্তু সঠিক পরামর্শের অভাবে নিরাপদ পদ্ধতিতে তারা কীটনাশক ব্যবহার করতে পারছেন না।
সরেজমিন উপজেলার সুখপুকুরিয়া, নারায়ণপুর, স্বরূপদাহ, ধুলিয়ানী, পাশাপোল, ফুলসারা, সিংহঝুলী, পাতিবিলা, জগদিশপুর, হাকিমপুর, চৌগাছা সদর ইউনিয়নসহ পৌর এলাকার সবজিক্ষেতগুলোতে দেখা যায়, কৃষকরা যত্রতত্র কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। কারো নাকে-মুখে কোনো কাপড় বা মাস্ক নেই। অনেক কৃষককে দেখা গেছে খালি গায়ে অথবা একটি গেঞ্জি পরেই কীটনাশক স্প্রে করছেন। কেউ কেউ ধানের জমিতে সারের সাথে আগাছানাশক মিশিয়ে খালি হাতে ক্ষেতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কোনো ধরনের হাতমোজা বা গ্লাভস ব্যবহার করা ছাড়াই এ কাজ করছেন তারা। কীটনাশকের প্যাকেট বা বোতলের গায়ে স্পষ্ট অক্ষরে ‘বিষ’ লেখা থাকলেও তা কেউ আমলেই নিচ্ছেন না। যে যার মতো করে জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছেন তারা।

উপজেলার বাঘারদাড়ি গ্রামের কৃষক নুরনবী বলেন, আমাদের এলাকাটি সবজিজোন হিসেবে খ্যাত। মাঠের পর মাঠ বেগুন, পটোল, করোলা, শিম ও মরিচের আবাদ হয়। আমার সবজিক্ষেতে সপ্তাহে দুই দিন কীটনাশক স্প্রে করি। বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা পেতে কোনো ধরনের প্রতিরোধ গ্রহণের ব্যবস্থা জানা নেই আমার।
একই গ্রামের কৃষক আরমান আলী বলেন, দীর্ঘ দিন থেকে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে সবজি ও নানা শস্যের আবাদ করি আমি। চলতি মৌসুমে এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আমন ধান রোপণ করেছি। চারা রোপণের পর চারা একটু সতেজ হয়ে উঠলেই বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই ও পোকার আক্রমণ শুরু হয়। এসময় কীটনাশক স্প্রে করতেই হয়।
পৌর এলাকার তারনিবাস গ্রামের কৃষক হাসানুর রহমান বলেন, কীটনাশক ছিটানোর সঠিক কোনো পদ্ধতি আছে কি না তা জানা নেই আমার। এ বিষয়ে কেউ পরামর্শও দেয়নি। কীটনাশক ছিটানোর সময় ওষুধের গন্ধে সারা দিনই মাথা ঘোরে, মাথাব্যথাও করে প্রচুর। পরে এমনিতেই সেরে যায়।

উপজেলা সরকারি মডেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: আল-ইমরান বলেন, কীটনাশক ছিটানোর সময় নিরাপদ পোশাক ও মুখে মাস্ক পরে নিতে হয়। তা না হলে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে কীটনাশক চলে যেতে পারে আপনার ফুসফুস ও পাকস্থলীতে। এতে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কারণে ফুসফুস, হৃদপিণ্ড এবং লিভার আক্রান্ত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে। হাত দিয়ে কীটনাশক বা সার ছিটানোর সময় হাতে গ্লাভস বা হাতমোজা পরে নিতে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন বলেন, জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার জন্য কৃষকদেরকে পরামর্শ দিয়ে আসছি। জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে জমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পায়। তাই কৃষকদের উচিত কীটনাশক ব্যবহার না করা এবং অধিক ফসল ফলানোর জন্য জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা। কীটনাশক ব্যবহারে কৃষকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে।