রংপুরের বদরগঞ্জে স্থানীয় এমপি, ডিসি ও এসপির উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারণায় থাকা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি সুমনা আক্তার লিলিকে বিভিন্ন গালাগাল ও হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের তিন নেতা ও এমপির পিএসের বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ওই প্রার্থী। 

রংপুর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া ও ডিএসবি) ইফতে খায়ের আলম নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আওয়ামী লীগ নেত্রী সুমনা আক্তার লিলি অভিযোগ থানায় জমা দিয়েছেন। বিষয়টির ব্যাপারে অনুসন্ধান ও যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।’

অভিযোগকারী রংপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে প্রচারণায় থাকা সুমনা আক্তার লিলি জানান, ‘আমি রাতেই অভিযোগপত্র থানায় জমা দিয়েছি, ওসির সাথে আজ আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, মামলা রেকর্ড হয়েছে। তবে এখনো কোনো আসামি ধরেনি। মামলার কপি হোয়াটসঅ্যাপে চেয়েছি। ওনি দেননি।’

এ ব্যাপারে বদরগঞ্জ থানার ওসি নজরুল ইসলাম মজুমদার জানান, ‘আমি অফিসিয়াল কাজে এসপি অফিসে আছি। এ বিষয়ে পরে জানাবো।’

থানায় দেয়া অভিযোগপত্রে সুমনা আক্তার লিলি দাবি করেছেন, ‘আমি সুমনা আক্তার লিলি বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ আসনের এমপি প্রার্থী। শনিবার (২১ অক্টোবর) সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার সপ্তমি থাকায় আমি তাদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে বদরগঞ্জ পৌরসভায় আসি। প্রথমেই বারোয়ারি পূজামন্ডপে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করি। এসময় সেখানে ডিসি, এসপি ও ইউএনও মহোদয় উপস্থিত ছিলেন। এসময় তাদের সাথেও আমি কুশল বিনিময় করি। এরপর সেখান থেকে ডিসি-এসপি মহোদয়সহ থানার সামনে ভবেশ্বর সাহা বারোয়ারী পূজামন্ডপে যাই। আমরা সেখানে যাওয়ার ৭/৮ মিনিট পর রানিং এমপি ডিউক ভাই, পৌর মেয়র টুটুল ভাই আসেন, যা আমি আগে থেকে জানতাম না। তারা এলে আমি চলে যাওয়ার জন্য বের হলে তাদের কর্মী ছাত্রলীগের সভাপতি মিম ও কলেজ ছাত্রলীগের রুবেল নেতৃত্বে আমাকে বাধা দেয় এবং ‘ভুয়া ক্যান্ডিডেট’ বলে চিৎকার করে। তখন আমি ব্যাক করে এসপি ও ডিসির পেছনে গিয়ে বসি। পূজার প্রোগ্রাম শেষ হলে বিষয়টি ডিসি মহোদয়কে জানাই। তিনি মৌখিকভাবে তাদের নিষেধ করে চলে যান।’

অভিযোগে আরো বলা হয়, ‘পরে আমি চলে আসতে চাইলে, এমপির পিএস আজাদ আমাকে হুমকি দেয়। নাম নাজানা ( ভিডিও ও ছবি আছে) দাড়িওয়ালা ব্যক্তি আমাকে দেখে নেবে, ছিড়ে ফেলবে, মেরে ফেলবে বলে ধাক্কা দেয়। আমি নিজেকে নিরাপত্তাহীন মনে করছি। বিষয়টি আইনগত ব্যবস্থা নিতে মর্জি হয়।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ‘ঘটনার পর সুমনা আক্তার লিলি চিৎকার করে বলছেন, আমাকে ধাক্কা দিলি কেন রে। আমি এই রাষ্ট্রের নাগরিক, আমি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মাঠের কর্মী। আমি শেখ হাসিনার কর্মী, আমার বিরুদ্ধে কথা বলে। আমি ভুয়া নই, ফ্রেস ক্যান্ডিডেট।’ এসময় একজনকে ছবি না তোলার জন্য বলতেও শোনা যায়।

অভিযোগ পত্রে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাফিউল ইবনে সরকার মিম এবং বদরগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা রুবেলের নাম উল্লেখ করলেও দাড়িওয়ালা এক নেতার নাম ‍উল্লেখ করেননি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা দাড়িওয়ালা ব্যক্তির নাম সাদ্দাম হোসেন। তিনি দলীয় কোনো পদ-পদবিধারী না হলেও উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলে রাব্বী সুইটের সফরসঙ্গী হিসেবে সময় সময় থাকেন।

এ ব্যাপারে বদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাফিউল ইবনে সরকার মিম জানান, “সেখানে এমপি, ডিসি-এসপিসহ সবাই ছিলেন। এসময় পূজামণ্ডপের পুণ্যার্থীরা ‘দুর্গা মায়কে জয় বলে’ স্লোগান দিচ্ছিলেন। উনি সম্ভবত ওই স্লোগানকেই ‘ভুয়া’ হিসেবে শুনেছেন। তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ থানায় দায়ের করেছেন। এরমাধ্যমে তিনি ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন।”

মিম আরো জানান, ‘কলেজ ছাত্রলীগে রুবেল নামে আমার কোনো নেতা নাই। তিনি রুবেল নামে কাকে মিন করতে চাইছেন এটা আমরা বলতে পারছি না। আমরা এই মিথ্যা অভিযোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

এদিকে, এমপির পিএস আবুল কালাম আজাদের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

তবে সাদ্দাম হোসেন জানিয়েছেন, ‘তিনি তাকে (লিলিকে) কোনো ধরনের হুমকি-ধামকি দেননি। সেখানে ছবি তোলাতুলি নিয়ে গ্যাঞ্জাম হচ্ছিল। আমি সেখানকার পরিবেশ শান্ত করেছি। তাকে সেভ করেছি।’

এ ব্যাপারে বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ আসনের এমপি আবুল কালাম মো: আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক নয়া দিগন্তকে জানান, ‘ওই মন্দির পরিদর্শনের সময় সেখানে ডিসি-এসপি মহোদয়সহ অনেক ব্যক্তিই ছিলেন। এ ধরনের কোনো ঘটনা সেখানে ঘটেনি।’ এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

উল্লেখ্য, আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক ২০১৪ ও ’১৮ সালে আওয়ামী লীগের হয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য। তিনি এবারো এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী।

একই সাথে এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন সুমনা আক্তার লিলি। তিনি রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। ইডেন মহিলা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স পাসের পর সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে আইন পাস করেছেন তিনি।