কক্সবাজার রেলপথ নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। প্রধান আকর্ষণ দেশের প্রথম আইকনিক রেলস্টেশন। এ যেন বিশাল আকৃতির একটি ঝিনুক। ঝিনুকের পেটে মুক্তার দানা। তার চার পাশে পড়ছে স্বচ্ছ জলরাশি। এর মধ্যেই আসছে ট্রেন। ঝকঝকে আধুনিক এ স্টেশন অনেকটাই উন্নত বিশ্বের বিমানবন্দরের মতো।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার নতুন রেলপথে প্রথমে চলবে তিন জোড়া ট্রেন। চট্টগ্রাম থেকে তিন ঘণ্টা ২০ মিনিট এবং ঢাকা থেকে আট ঘণ্টা ১০ মিনিটে কক্সবাজারে পৌঁছাবে এসব ট্রেন। প্রতিটি ট্রেনে ১৮টি করে বগি থাকবে। ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলবে। তবে পর্যায়ক্রমে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কক্সবাজারের সাথে যুক্ত হবে। ঢাকা থেকে যে ট্রেনটি কক্সবাজারে যাবে, সেটি নতুন ট্রেন। চট্টগ্রাম থেকে যে দু’টি ট্রেন আসা-যাওয়া করবে, সেগুলো পুরনো বগি দিয়ে চলবে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো: শহিদুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়েছেন।
গত ১৬ অক্টোবর কালুরঘাট সেতুর সংস্কারকাজ পরিদর্শন করেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। এ সময় মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী ১২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার রেললাইন উদ্বোধনের জন্য সময় দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে আগামী ২ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ট্রেন চলবে।’
চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী ১২ নভেম্বর কক্সবাজারের পথে ট্রেন চলাচল উদ্বোধনের কথা রয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলবে ২০ থেকে ২৫ নভেম্বর থেকে। কক্সবাজার রুটে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম থেকে ছয় জোড়া ট্রেন চলাচলের পরিকল্পনা আছে। তবে ইঞ্জিন ও বগি সঙ্কটের কারণে এখনই তা হচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া এবং ঢাকা থেকে এক জোড়া ট্রেন পর্যটন শহর কক্সবাজারে থেকে আসা-যাওয়া করবে। তিনটি ট্রেনই আন্তঃনগর। তবে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি শুধু চট্টগ্রাম স্টেশনে দাঁড়াবে। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে চট্টগ্রাম থেকে টিকিট বিক্রি করা হবে। ট্রেনটি অন্য কোনো স্টেশনে দাঁড়াবে না। সরাসরি কক্সবাজার যাবে। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো মাঝপথে কয়েকটি স্টেশনে দাঁড়াবে।’ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্র জানায়, কক্সবাজারগামী ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছাড়বে রাত সাড়ে ১০টায়। সেটি চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছবে রাত ৩টা ৪০ মিনিটে। ২০ মিনিট পর রাত ৪টায় চট্টগ্রাম স্টেশন ছেড়ে সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজার পৌঁছবে। পুনরায় ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার স্টেশন থেকে ছাড়বে বেলা ১টায়। চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছবে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে। চট্টগ্রাম থেকে বিকেল ৪টায় ছেড়ে রাত ৯টা ৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোর মধ্যে একটি সকাল ৭টায় চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ছেড়ে ষোলশহর, জানআলী হাট, পটিয়া, দোহাজারী, সাতকানিয়া, চকরিয়া, ডুলহাজারা ও রামু স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানামা করাবে। এরপর সকাল ১০টা ২০ মিনিটে কক্সবাজারে পৌঁছবে। চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে আরেকটি ট্রেন বেলা ৩টা ১০ মিনিটে ছেড়ে ষোলশহর, জানআলী হাট, পটিয়া, দোহাজারী, সাতকানিয়া, চকরিয়া, ডুলহাজারা ও রামু স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানামা করাবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কক্সবাজার স্টেশনে পৌঁছবে।
একইভাবে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে প্রথম ট্রেনটি ছাড়বে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে। এটি রামু, ডুলহাজারা, চকরিয়া, সাতকানিয়া, দোহাজারী, পটিয়া, জানআলী হাট, ষোলশহর স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানামা করাবে। বেলা ২টা ১৫ মিনিটে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছবে। কক্সবাজার স্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে দ্বিতীয় ট্রেনটি ছাড়বে সন্ধ্যা ৭টায়। এটি রামু, ডুলহাজারা, চকরিয়া, সাতকানিয়া, দোহাজারী, পটিয়া, জানআলী হাট, ষোলশহর স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানামা করাবে। রাত ১০টা ৫ মিনিটে চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছবে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম দিকে সব ক’টি স্টেশনে থামাবে না ট্রেন। স্টেশনগুলোর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর থামবে। এজন্য স্টেশনগুলোতে লোকবল পদায়নের কাজও শুরু হয়েছে।
কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চালানোর চাহিদা অনেক উল্লেখ করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী তাপস কুমার দাস বলেন, ‘লোকবল ও ইঞ্জিন সঙ্কটের কারণে কতটি ট্রেন চালানো যাবে, তা বোঝা যাচ্ছে না। ঢাকা থেকে যে ট্রেনটি চলবে, সেটি নতুন। এটিতে ১৮টি বগি থাকবে।’ দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ আবুল কালাম চৌধুরী বলেন, ‘দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। ট্রলির সাহায্যে কয়েকবার টহলও দেয়া হয়েছে। রেললাইন এখন চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রকল্পের অগ্রগতি ৯২ শতাংশ। এখন স্টেশনগুলোর কাজ চলছে। সড়কে লাইট লাগানোর কাজ চলছে। কক্সবাজারে নির্মাণাধীন ছয়তলা আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের কাজ শেষ হয়েছে। রামু ও ডুলহাজারা স্টেশনের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। বাকি স্টেশনগুলোর কাজও শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পের অধীন ৩৯টি বড় সেতু, ২৪২টি কালভার্ট এবং ১৪৪টি লেভেল ক্রসিংয়ের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। সব ক’টি স্টেশনে থাকবে কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলক সিগন্যাল সিস্টেম এবং ডিজিটাল টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম।’
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেললাইন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার এবং রামু থেকে কক্সবাজার ১২ কিলোমিটার। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের প্রায় সাত বছর পর ২০১৮ সালে ডুয়েল গেজ এবং সিঙ্গেল ট্র্যাক রেললাইন প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথমে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। পরে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এতে অর্থায়ন করেছে এশিয়ান ব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকার। এটি সরকারের অগ্রাধিকার (ফাস্ট ট্র্যাক) প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৯২ শতাংশ। ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৯২ কিলোমিটার অংশে রেললাইন বসানোর কাজ শেষ।
কক্সবাজার রেলপথ নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই
কক্সবাজার রেলপথ নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। প্রধান আকর্ষণ দেশের প্রথম আইকনিক রেলস্টেশন। এ যেন বিশাল আকৃতির একটি ঝিনুক। ঝিনুকের পেটে মুক্তার দানা। তার চার...



