রংপুরের পীরগাছায় শতাধিক গ্রাহকের প্রায় ৮ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছেন সাকসেস বিজনেস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিঃ নামক একটি সংস্থা। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন ভূক্তভোগীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

জানা গেছে, উপজেলার রামচন্দ্রপাড়া গ্রামের খোরশেদ আলমের ছেলে জনি মিয়া উপজেলা সমবায় অধিদফতর, পীরগাছা থেকে রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে সাকসেস বিজনেস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিঃ নামে একটি সমিতি খোলেন। যার রেজিস্ট্রেশন নং ৩৩/১৮।
জনি মিয়া পীরগাছা ও পাশের সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় কাজ করেন, তিনি অধিক মুনাফা প্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে আমানত সংগ্রহ করেন। এইভাবে তিনি প্রায় আট কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেন। প্রথম কয়েক মাস এক লাখ টাকার বিপরীতে দুই হাজার টাকা করে মুনাফা প্রদান করলেও হঠাৎ করে তিনি (জনি) মুনাফা দেয়া বন্ধ করে দেন। মুনাফার টাকা গ্রাহকরা না পাওয়ার কারণে তাদের আসল জমাকৃত টাকা ফেরত প্রদানের জন্য চাপ দিলে নানান তালবাহানা করে টাকা না দিয়ে বর্তমানে পরিচালক জনি মিয়া আত্মগোপনে চলে গেছেন।

উপজেলার মকসুদ খাঁ গ্রামের ভূক্তভোগী মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আমি ঢাকা শহরে মানুষের বাসায় বুয়ার কাজ করি। অনেক কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। আমি সাকসেস সমিতিতে আমার প্রতিবেশী মোজাফ্ফর হোসেনের ছেলে ওই সমিতির ম্যানেজার রাসেল মাহমুদ জীবনের মাধ্যমে দুই লাখ টাকা রেখেছিলাম। প্রথম তিন মাস আমাকে লাভ প্রদান করা হলেও এখন লাভ বা আসল কোনটাই দিচ্ছে না।’

একই গ্রামের আজিরন বেগম বলেন, ‘আমি রাস্তার মাটি কাটার কাজ করি। আমি অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে ওই সমিতিতে ৫০ হাজার টাকা রেখেছিলাম। এখন তারা আমাদেরকে লাভ বা আসল কোনটাই দিচ্ছে না। ম্যানেজার জীবন আমাদেরকে বলেছে সমিতির মালিক না-কি পলাতক রয়েছে। আমরা সমিতির অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে শুনি ম্যানেজার জীবন সব টাকা তুলে নিয়ে গেছেন।’

ভূক্তভোগী রোকসানা বেগম বলেন, ‘আমি ওই সমিতিতে ৬০ হাজার টাকা রেখেছিলাম। এখন তারা বলতেছে তারা একটি টাকাও দিবে না।’

ভূক্তভোগী ষাটোর্দ্ধ বৃদ্ধা জরিনা বেগম বলেন, ‘আমি খুব কষ্টে মানুষের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে চলি। আমি অসুস্থ মানুষ। কামাই রোজগার করতে পারি না। মানুষের দেয়া টাকা জমিয়ে আমি ওই সমিতিতে এক লাখ টাকা রেখেছিলাম। সমিতির ম্যানেজার জীবন আমাকে বলেছিল যে দাদী আমাকে টাকাটা দেন, আমি তোকে প্রতি মাসে লাভ দিব। এখন তারা আমাকে লাভ আসল কিছু দিচ্ছে না।

স্থানীয় সাইদুর রহমান ও হাফিজার রহমান বলেন, রামচন্দ্রপাড়ার জনি নামের এক ছেলে সাকসেস সমিতি খুলে ম্যানেজার নিয়োগ দিয়ে লাখ প্রতি মাসে দুই হাজার প্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ মানুষদের কাছে টাকা নেয়। টাকা নেয়ার সময় তারা একটা ফরম পূরন করে নিতো ও পাশ বই দিত। কিছুদিন লাভ দিলেও এখন জনি ও ম্যানেজার জীবন গা ঢাঁকা দিয়েছে। আমরা চাই এই গরীব অসহায় মানুষদের টাকা যেন উদ্ধার করে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় কৈকুড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর আলম বলেন, ‘আমি বিষয়টি আগে জানতাম না। যখন তারা মানুষের টাকা আত্মসাৎ করে তখন আমি খোঁজ নিয়ে শুনেছি তারা সমিতিতে লাখে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা কমিশনে কিছু ছেলেকে চাকরি দিয়ে তাদের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করতো। এভাবে প্রায় সাত থেকে আট কোটি টাকা নিয়ে সমিতির পরিচালক জনি মিয়া পরিবারসহ এখন লাপাত্তা। এখন এই ভূক্তভোগীরা আমার ও মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেছে। আমরা এখন আইনগতভাবে যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেটা করবো।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সমিতিটির পরিচালক জনি মিয়া ও ম্যানেজার রাসেল মাহমুদ জীবনের বাড়িতে গেলে তাদেরকে বাড়িতে না পাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।

উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা বলেন, ২০২১ সালের আগের কোনো তথ্য আমাদের অফিসে সংগ্রহে নাই। ওই সমিতিটি আমাদের মাধ্যমে নিবন্ধন করা। আমি দুই বছর হয় এখানে এসেছি। আমি ২০২১ সালে ওই সমিতি অডিট করেছি। ২০২২ সালে আমার সহকারী করেছে। ২০২৩ সালের অডিট জেলা অফিস থেকে হওয়ার কথা। সম্প্রতি কিছু অনিয়মের বিষয় জানতে পেরে আমি ওই সমিতি পরিদর্শন করার জন্য নোটিশ করেছিলাম। নোটিশ দিতে গিয়ে তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা কোথায় আছে কেউ বলতে পারে না। এখন আমরা অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হক সুমন বলেন, সাকসেস বিজনেস কো-অপারেটিভ নামে একটি সোসাইটি আছে, সমবায়ের রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত। যারা গ্রামের দরিদ্র অসহায় নারীদের কাছে মাসিক ভিত্তিতে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করে পালিয়েছে। পালিয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। বিষয়টি জানার পরে সমবায় অফিসার এবং থানার অফিসার ইনচার্জের সাথে কথা বলেছি। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যা যা করণীয় আমরা তা করবো।