যশোরের চৌগাছায় আমন-ধান কাটা শুরু হয়েছে। এবার ধানের দাম কম হওয়ায় বিঘাপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে বলে জানান কৃষকরা। এ কারণে বর্গচাষিদের এখন মাথায় হাত। আগাম আমন ধানের আবাদ হওয়ায় এই কার্তিক মাসেই কৃষকদের ধান কাটার ধুম পড়ে গেছে। কিন্তু এমন ধান কাটার মৌসুমেও তাদের মনে আনন্দ নেই।
কৃষকদের স্বপ্ন ছিল পাকা ধান ঘরে তুলবেন, বেশি দামে ধান বিক্রি করে লাভবান হবেন তারা। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে যখন নিম্নআয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, ঠিক তখন এই আগাম আমন ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন এবং সেই হাসি এখন ম্লান হতে চলেছে। ধান ঘরে তুললেও দাম কম বিধায় তারা খুশি হতে পারছেন না।
গতকাল রোববার (৫ নভেম্বর) উপজেলার বিভিন্ন মাঠে সরেজমিন দেখা যায়, মাঠে মাঠে আগাম ধান কাটা শুরু হয়েছে। কেউ ধান কাটছেন, কেউ ধান বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউবা জমিতে, কেউবা বাড়ির উঠোনে ধান মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। চলতি মাসেই চৌগাছা উপজেলায় আগাম জাতের আমন ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহ পরে শুরু হবে ধান কাটার মহোৎসব। ব্যস্ততম সময় কাটাবে কৃষক-কৃষানীদের। খুব সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে সোনালি স্বপ্ন ঘরে তোলার কাজ। কিন্তু ধানের দাম আশানুরূপ না থাকায় চাষিদের মন বেজার। অপর দিকে শ্রমিকদের মজুরি বেশি ও শ্রমিক সঙ্কট থাকায় অনেকেই ধান নিয়ে পড়েছেন বেকায়দায়।
এ দিকে বাজার ঘুরে জানা গেছে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকায়। ধানের দাম ভালো না হওয়ায় কৃষকের মাথায় হাত।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য কর্মকর্তা রাশেদুল ইসলাম জানান, চলতি আমন মৌসুমে এ উপজেলায় আগাম জাতসহ ব্রি-৫১, ব্রি-৪৯, ব্রি-৭৫, ব্রি-৮৭, রড মিনিকেট, বিনা-১৭, স্বর্না ও প্রতীক জাতের ধানের আবাদ হয়েছে ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৯ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন।
উপজেলার বাঘারদাড়ি গ্রামের কৃষক নুরুনব্বী বলেন, এবার সার ও কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় আর্থিক সঙ্কটের মধ্যেও ধান চাষ করেছি। গত বছর এক বিঘা জমির ধান কাটা ও মাড়াই করতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা লেগেছে। পোকার আক্রমণ আর নানা রোগবালাইয়ের পরও এবারও আমন ধানের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন কৃষকরা। কিন্তু ধান কাটার শ্রমিকদের প্রায় দুই গুণ বেশি মজুরি দিতে হচ্ছে। তবুও শ্রমিক সঙ্কট কাটছে না।
সিংহঝুলী গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, দুই বিঘা জমির ধান কাটা-মাড়াই শেষ করেছি। আগাম ধান ঘরে উঠাতে পেরে খুশি। এবার অনেক ধারদেনা করে আমন ধান করেছিলাম। ধানের দাম ভালো না পাওয়ায় দেনা শোধ করতে পারছি না। তিনি বলেন, এক বিঘা আমন ধানে জমি লিজ, বীজতলা তৈরি, জমি তৈরি, রোপণ, সার, ওষুধ, নিড়ানী, সেচ, কাটা, মাড়াই ও বহন বাবদ খরচ হয় প্রায় ২৪ হাজার টাকা। এক বিঘায় ধানের ফলন হয়েছে গড়ে ১৫-১৬ মণ। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ১১-১২ হাজার টাকায়। নিজের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের কথা বাদই দিলাম। তবুও প্রতি বিঘায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে আমার। আমার মতো বর্গাচাষিদের মাথায় হাত। ধান চাষে যে খরচ হয়েছে তাতে কম পক্ষে ১৫শ’ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে পারলে লাভ হতো।
ধান চাষি পাশাপোল গ্রামের মমিনুর রহমান, কয়ারপাড়া গ্রামের ইউনুচ আলী, মাসুদুর রহমান, আবুল কালাম, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের নুরুজ্জামান বলেন, ধান চাষে জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত এক বিঘা জমিতে প্রায় ২৪ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে যারা বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পের পানি এবং নিজেরাই পরিচর্চা করতে পেরেছেন, তাদের জন্য খরচ কিছুটা কম তো হতেই পারে। সেক্ষেত্রে প্রতি মণ ধান ১৫শ’ টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারলে তাদের আসল উঠে আসত।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি জমিতে ধান চাষা হয়েছে। ধানের আশানুরূপ ফলন হয়েছে। এ বছরে আবহাওয়া ভালো ছিল। তাই ধানের ফলনও ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে কৃষকরা ধান কাটতে শুরু করেছেন। উপজেলা কৃষি অধিদফতরের পক্ষ থেকে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা হবে। এতে শ্রমিক সঙ্কট অনেকটা কমে আসবে।