শীত মৌসুমে মৎস্য আহরণে জেলেদের সমুদ্রযাত্রা শুরু হয়েছে। নভেম্বরেই শুরু দুবলারচরের শুঁটকি মৌসুম। জীবনের ঝুঁকি ও ঋণের বোঝা নিয়ে সমুদ্রে যাত্রা করছেন জেলেরা। সমুদ্রে মৎস্য আহরণকে ঘিরে তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ আহরণ করে চলেছেন উপকূলের জেলে ও মহাজনেরা। সাগরে যেতে যে যার মতো প্রস্তুত করছেন জাল, দড়ি, নৌকা-ট্রলার। কেউ কেউ গড়ছেন নতুন ট্রলার, আবার কেউ পুরাতন নৌকা মেরামত করে নিয়েছেন। প্রস্তুতি অনুযায়ী অনেকেই আগেভাগেই তারা রওনা দিয়েছেন।
দুবলার চর বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি দ্বীপ যা হিন্দুধর্মের পূণ্যস্নান, রাসমেলা ও হরিণের জন্য বহুল পরিচিত। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মধ্যে এটি একটি বিচ্ছিন্ন চর। আলোরকোল, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া ও মেহের আলির চর নিয়ে দুবলার চর গঠিত। দুবলার চরে তৈরি হয় জেলে গ্রাম। মাছ ধরার সাথে সাথে চলে শুঁটকি তৈরির কাজও। বর্ষা মৌসুমের ইলিশ শিকারের পর বহু জেলে চার মাসের জন্য সুদূর কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে ডেরা বেঁধে সাময়িক বসতি গড়েন সেখানে। মেহের আলীর খাল, আলোরকোল, মাঝেরচর, অফিসকেল্লা, নারিকেলবাড়িয়া, মানিকখালী, ছাফরাখালী ও শ্যালারচর ইত্যাদি এলাকায় জেলে পল্লী স্থাপিত হয়। এই চার মাস তারা মাছকে শুঁটকি বানাতে ব্যস্ত থাকেন। এখান থেকে শুঁটকি চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের পাইকারী বাজারে মজুদ ও বিক্রি করা হয়।
সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগ থেকে মাছ সংগ্রহের অনুমতি সাপেক্ষে বহরদার ও জেলেরা দুবলার চরে প্রবেশ করে থাকেন। দুবলার চর থেকে সরকার নিয়মিত হারে রাজস্ব পেয়ে থাকে। প্রতি বছর বিএলসি বা বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট, ডিএফসি বা ডেইলি ফুয়েল (জ্বালানি কাঠ) কনজাম্পশন ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় বন বিভাগকে রাজস্ব দিয়ে মৎস্য ব্যবসায়ীরা সুন্দরবনে ঢোকার অনুমতি পান। এ ছাড়া আহরিত শুঁটকি মাছ পরিমাপ করে নিয়ে ফিরে আসার সময় মাছভেদে দিতে হয় নির্ধারিত রাজস্ব।
খুলনা জেলার বিভিন্ন নদ-নদী পলিজমে ভরাট হওয়ায় শুধুমাত্র সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে এবং নানা প্রতিকূলতায় ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারেনি জেলে পরিবারগুলো। বরং দিন দিন তাদের অবস্থার অবনতি ঘটেছে। ক্রমবর্ধমান ক্ষতির মুখে ইতোমধ্যে পূঁজি ও জাল-নৌকা হারিয়ে পেশা হারিয়েছেন অনেকে। আবার অনেকে চড়া হারে মহাজনদের সুদের মাশুল গুণে এ পেশায় টিকে থাকার জন্য কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তফশিলি ব্যাংক থেকে জেলেদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন শর্তজুড়ে দেয়ায় তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। উপজেলার বোয়ালিয়া জেলে পল্লীর বাসিন্দা শিতেনাথ বলেন, প্রতি বছর আমরা মহাজনসহ বিভিন্নভাবে ঋণ করে সমুদ্রে যাই। সরকারিভাবে আমরা তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাই না। সুন্দরবনে জলদস্যু-বনদস্যুর উৎপাত ও মুক্তিপণ আদায়সহ আসাধু বনরক্ষীদের দৌরাত্ম্য কিছুটা বন্ধ হলেও এখনো সীমাহীন সমস্যায় মধ্যে থাকতে হয় আমাদের।
জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা প্রতিবছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র থেকে মাছ ধরে সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব এনে দেই। কিন্তু আমরা সহজ শর্তে কোনো ঋণ পাই না। জেলেদের সব সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণসহ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান তারা।