ঢাকার দোহার উপজেলার জয়পাড়া বাজারে খাবার বিক্রি করেন আব্দুর রউফ। সপ্তাহে একদিন খাবার বিক্রির পাশাপাশি তিনি অসহায়দের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন। অনাহারী, পথচারী, ভিক্ষুক কিংবা মানসিক রোগী এ ধরনের মানুষকেই তিনি বেছে নিয়েছেন। তিন বছর যাবৎ তিনি এ মহৎ কাজটি করে যাচ্ছেন। মধ্য বয়সী আব্দুর রউফ সবার কাছে নিবেদিত এক মানুষ।

আব্দুর রউফ ওই উপজেলার উত্তর জয়পাড়া খালপাড় এলাকার আরশেদ আলীর ছেলে।

আব্দুর রউফ জানান, ‘এইচএসসি পাশ করার পর বেকার না থেকে বাপ-দাদার পেশা হিসেবে পরিবারের সাথে তাঁতের লুঙ্গি বুনানোর কাজ করতেন। একটা সময়ে লুঙ্গি তৈরির জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া ও লুঙ্গির ন্যায্য দাম না পাওয়াতে পুরনো পেশা ছেড়ে ১৯৯৮ সালে রেষ্টুরেন্টের চাকরি নিয়ে মধ্যপাচ্যের দেশ সৌদি আরব চলে যান। সেখানে সুনামের সাথে বাবুর্চির কাজ করেন। বিদেশে গেলেও মন পড়ে থাকে দেশে। তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর সৌদি আররে কাজ করার পর অবশেষে দেশে চলে আসেন। দেশে এসে ভাবতে থাকেন, কিছু একটা করা প্রয়োজন। যেহেতু রেষ্টুরেন্টে কাজ করার আগের অভিজ্ঞতা রয়েছে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাত বছর আগে বাজারে একটি খাবার হোটেল দেন। প্রতিষ্ঠনটির নাম দেন আল রাফিজা খিচুরি ও বিরিয়ানি ঘর। যেখানে বাবুচির কাজটি করেন তিনি এবং তার সাথে রয়েছে বেতনভুক্ত দু’জন কর্মচারী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খোলা থাকে তার রেষ্টুরেন্ট। খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী মানুষের আয়ের বিষয়টি মাথায় রেখেই শুরু থেকে স্বল্প দামে তিনি খাবার বিক্রি করেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তার খাবারের হোটেলটি পরিচিত লাভ করে। এরই মধ্যে তিনি অসহায় মানুষদেরকে বিনা পয়সায় খাবার তুলে দেন। একদিন তার মাথায় আসে হোটেলের আয় থেকে তিনি অনাহারী মানুষদের জন্য সপ্তাহে একদিন খাবারের ব্যবস্থা করবেন। বিভিন্ন সময়ে ইসলামী বক্তাদের আলোচনা থেকে জানতে পারেন ক্ষুধার্ত খাওয়ালে অনেক নেকি পাওয়া যায়। সেই অনুভূতি থেকেই তিনি পথচারী কিংবা অনাহারী মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন। দেড় বছর ধরে প্রতি রোববার ক্ষুর্ধাত মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে আসছেন। সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত জয়পাড়া ও আশপাশের এলাকা থেকে গরীব, অসহায় লোকজন এসে হোটেলে বসে খেয়ে থাকেন। একেক সপ্তাহে খাবাবের মেনু একেক রকম হয়ে থাকে। যেমন : কোনো সপ্তাহে খিচুরি-ভর্তা, পরের সপ্তাহে ভাত-মাছ আবার এর পরের সপ্তাহে বিরিয়ানি।

শুরুর দিকটায় ২০ থেকে ২৫ জন লোক খাবার খেলেও দিন দিন বেড়েই চলেছে এ সংখ্যা। বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ প্রতি রোববার খাবার খাচ্ছে।

জয়পাড়া বাজারের ব্যবসায়ী দেওয়ান শাহজাহান জানান, আব্দুর রউফ ছোটবেলা থেকে একজন উদার প্রকৃতির মানুষ। মানুষের প্রতি তার শ্রদ্ধা অন্যরকম। তিনি ক্ষুদ্র একজন হোটেল ব্যবসায়ী হয়েও অনাহারী মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করেন এটা সত্যিই আমাকে ভীষণভাবে অবাক করেছে।

সুবিধাভোগীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, প্রতি রোববার আমরা এখানে তৃপ্তি সহকারে খাবার খেয়ে থাকি। অতি যত্নসহকারে খাবার দেয়। আমরা এতে অনেক খুশি। আল্লাহ তায়ালা যেন এর চেয়ে উত্তর প্রতিদান দেন তাকে।

এ ব্যাপারে আব্দুল রউফ জানান, ‘ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের বাড়িতে কেউ এলে তাকে না খেয়ে যেতে দিতেন না। আর আমি যেহেতু হোটেল ব্যবসা করি। আমারতো কম-বেশি আয় হয়। আর আয়ের একটা অংশ থেকে আমি গবীর মানুষকে খাওয়ানোর আয়োজন করে থাকি। আল্লাহ আমাকে যতদিন তৌফিক দিবেন ততদিন পর্যন্ত আমি এসব মানুষজনকে খাবার দিয়ে যেতে চাই। এজন্য আমি মানুষের কাছে কোনো সহযোগিতা চাই না, আমি যাতে সুস্থ থেকে তাদের সেবা করে যেতে পারি এজন্য সবার দোয়া চাই।’