যশোরের চৌগাছা উপজেলার সীমান্তগুলো যেন স্বর্ণপাচারের প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করছে স্বর্ণ চোরাচালানিরা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা চলতি বছরে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে ২৯৭টি স্বর্ণ বারসহ পাঁচ চোরাকারবারিকে আটক করে। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের ওজন প্রায় ৪৭ কেজি। ভরি হিসেবে যার পরিমাণ হয় তিন হাজার ৭৬০ ভরি এবং বাজারমূল্য হয় প্রায় ৩৮ কোটি টাকা। জানা যায়, ২০২৩ সালের ১১ মাসে উপজেলার কাবিলপুর, আন্দুলিয়া, মাসিলা, লক্ষ্মীপুর, বল্লভপুর ও দৌলতপুর সীমান্ত থেকে বিজিবি উল্লিখিত পরিমাণ স্বর্ণের বার জব্দ করে।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের একটি সূত্রে বলছে, এ সীমান্ত পথে যে পরিমাণ স্বর্ণ আটক হয় তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি স্বর্ণ লোকচক্ষুর অন্তরালে পাচার হয়ে যায়। চলতি বছরের ২৬ অক্টোবর বেলা দেড়টার দিকে উপজেলার মাশিলা সীমান্তের লক্ষ্মীপুর গ্রামে অভিযান চালিয়ে ভারতে পাচারের সময় ছয়টি স্বর্ণের বারসহ নাঈম হোসেন (১৮) নামে এক যুবককে আটক করে বিজিবি। আটক নাঈম মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার উজ্জ্বল হোসেনের ছেলে।
গত ২২ আগস্ট সন্ধ্যায় সীমান্তের বড় আন্দুলিয়া থেকে দুই পাচারকারীকে আটক করে বিজিবি। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৩ কেজি ৪৬৪ গ্রাম ওজনের ৪৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। যার বর্তমান বাজারদর আনুমানিক প্রায় ১৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। আটককৃতরা হলেন, যশোর সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের মহিউদ্দিনের ছেলে শাওন হোসেন ও মাগুরার শালিকা উপজেলার ছয়ঘড়িয়া গ্রামের কুদ্দুস মোল্লার ছেলে রফিকুল ইসলাম।
গত ৫ জুন সকাল ১০টার দিকে উপজেলার কাবিলপুর সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ২৬টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে বিজিবি। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। তবে এ অভিযানে কাউকে আটক করা যায়নি।
গত ১০ এপ্রিল কাবিলপুর শ্মশানঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাহ আলম (৩৫) নামে এক স্বর্ণ চোরাকারবারিকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪ কেজি ওজনের ১২৪টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। আটক ব্যক্তি উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের বাসিন্দা।
এদিকে অতি সম্প্রতি উপজেলার শাহজাদপুর সীমান্তের একটি মরিচ ক্ষেতের মাটি খুঁড়ে ৯ কেজি ২৮০ গ্রাম ওজনের ৮০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে বিজিবি। যার বাজারমূল্য আনুমানিক আট কোটি ৩৫ লাখ টাকা। উপজেলার তিলকপুর সীমান্ত থেকে নাজমুল হোসেন (২২) নামে এক স্বর্ণ চোরাকারবারিকে আটক করে বিজিবি। এ সময় তার কাছ থেকে দুই কেজি ওজনের ১৮টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। আটক নাজমুল চৌগাছা উপজেলার ঝিনাইকুণ্ডু গ্রামের শরিফুল আলম বাবুর ছেলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত থেকে চলতি বছরে বিজিবিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৪৭ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে। তবে এসব স্বর্ণ উদ্ধারে কেবলমাত্র বহনকারী শ্রমিকরাই আটক হন। মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার স্বর্ণ উদ্ধার ও বহনকারীরা গ্রেফতার হলেও পরবর্তী তদন্তে তারা মুখ না খোলায় মূল হোতাদের মুখোশও উন্মোচিত হয় না। এ কারণে স্বর্ণ পাচার কমছে না।
সীমান্তবর্তী কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, ভারতে স্বর্ণের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপ, যশোরের বেনাপোল আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর ৮৫ কিলোমিটার দূরত্বে কলকাতার অবস্থান, যশোর থেকে চৌগাছা উপজেলার সীমান্তগুলোও কম দূরত্বের মধ্যে হওয়ায় এবং যাতায়াতব্যবস্থা সুবিধাজনক বিধায় চোরাকারবারিরা এসব রুট ব্যবহার করে থাকে।
সর্বশেষ গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে ছয়টি স্বর্ণের বারসহ আটক নাঈম হোসেন জানান, তারা স্বর্ণ ভারতে পাচার করে বিনিময়ে ইউএস ডলার নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল। তবে তিনি স্বর্ণপাচারের মূল মালিকের নাম বলেননি।
গত ২০ মে চৌগাছার বড় কাবিলপুর শ্মশানঘাট থেকে আটক স্বর্ণপাচারকারী শাহআলম জানান, তিনি এর আগেও ছয়বার এই পথেই স্বর্ণ পাচার করেছেন। অতি আপনজনের দেয়া তথ্যে সপ্তমবারে তিনি ধরা পড়েন। তবে তিনিও স্বর্ণের মূল মালিকের নাম বলতে পারেননি।
বাংলাদেশ জুয়েলারি ব্যবসায়ী সমিতি চৌগাছার সভাপতি দিদারুল ইসলাম বলেন, বিজিবির কাছে যে পরিমাণ স্বর্ণ আটক হয়, এর চেয়ে অনেক বেশি স্বর্ণ পাচার হয়ে যায়। কিন্তু স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
এ ব্যাপারে যশোর ব্যাটালিয়ন ৪৯ বিজিবি আন্দুলিয়া কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার মজিবুর রহমান বলেন, স্বর্ণসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান রোধে বিজিবি সদস্যরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। স্বর্ণ চোরাচালানিদের বিশেষ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে গোয়েন্দারা কাজ করে যাচ্ছে। স্বর্ণ চোরাচালানে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের ছাড় দেয়া
হবে না।



