আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসন থেকে আওয়ামী লীগের অন্তত ১২ জন মনোনয়ন চাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। আর নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় হলে এ আসন থেকে বিএনপির দু’জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে। ভালুকায় মোট ভোটার তিন লাখ ৬১ হাজার ৪৬৩ জন। ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে এ আসনটি গঠিত।
ভালুকা তিন শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধ্যুষিত শিল্পনগরী। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০১ সালে পর্যন্ত আসনটি আওয়ামী বিরোধী শিবিরের দখলে ছিল। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এ আসনটি চলে যায় আওয়ামী লীগের দখলে। তার পর ২০১৪ সালে একতরফা ও ২০১৮ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এমপি নির্বাচিত হয়।
শিল্পাঞ্চল হওয়ায় কাজের জন্য সারা দেশের প্রায় ২০ লাখ লোক ভালুকায় বসবাস করেন; যে কারণে এ আসনটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর একটি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট মোস্তফা এম এ মতিন বিজয়ী হন। ১৯৭৯ সালে মুসলিম লীগ থেকে আফতাব উদ্দিন চৌধুরী চাঁন মিয়া এবং ১৯৮৬ সালে চাঁন মিয়ার ছেলে আমান উল্লাহ চৌধুরী এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালের একতরফা নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মেজর (অব:) আব্দুল হামিদ বিজয়ী হন। নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি প্রার্থী আমান উল্লাহ চৌধুরী এমপি হন। ১৯৯৬ সালে থেকে টানা চারবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা: এম আমান উল্লাহ এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজিমউদ্দিন আহম্মেদ ধনু বিজয়ী হন।
বর্তমানে ভালুকায় বিএনপি দু’ভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপের নেতৃত্বে ফখর উদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু ও অপর গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম। দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করে তারা। সম্প্রতি মোর্শেদ আলম গ্রুপ বেশ চাঙ্গা। তবে দীর্ঘ দিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং নেতাকর্মীরা বিভিন্ন মামলায় আসামি থাকায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে দলটি। তবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন ও সঠিক প্রার্থী দিতে পারলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করেন এলাকার সাধারণ ভোটাররা।
আওয়ামী লীগের কয়েকটি গ্রুপ থাকলেও দলীয় কর্মসূচি একসাথে পালন করে তারা। মনোনয়নের জন্য আবারো চেষ্টা করে চলেছেন বর্তমান এমপি কাজিম উদ্দিন আহম্মদ ধনু, নারী এমপি মনিরা সুলতানা মনি, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শাহ আশরাফুল হক জজ, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলহাজ এম এ ওয়াহেদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ গোলাম মোস্তফা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা: কে বি এম হাদিউজ্জামান সেলিম, জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হাজী রফিকুল ইসলাম, ঢাকার মনিপুরীপাড়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহাদাত ইসলাম চৌধুরী মিন্টু, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম পিন্টু, কেন্দ্রীয় কৃষকলীগ নেতা আসাদুজ্জামান বিপ্লব, সাবেক এমপি অধ্যাপক এম আমান উল্যাহর ছেলে ডা: মোনাসির সাকিফ আমান উল্লাহ ও অ্যাডভোকেট রাখাল চন্দ্র সরকার। এ দিকে বিএনপি নির্বাচনে এলে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু ও যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্য না হলে জাতীয় পার্টি থেকে উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন মাস্টার নির্বাচন করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
এমপি আলহাজ কাজিম উদ্দিন আহম্মদ ধনু জানান, তিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি, একবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও একবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। গত চার বছরে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। বর্তমানে ভালুকায় প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
অ্যাডভোকেট মোস্তফা এম এ মতিনের মেয়ে সংরক্ষিত মহিলা আসনের (ময়মনসিংহ) সংসদ সদস্য মনিরা সুলতানা বলেন, তিনি মুমিনুন্নেছা কলেজের ছাত্র সংসদে তিনবার ভিপি, দু’বার উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকায় মানুষের সেবা করেছেন। আগামীতেও শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে চান।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ গোলাম মোস্তফা বলেন, ভালুকার আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। ১৯৯৬ থেকে অদ্যাবধি নৌকার প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝ থেকে যাচাই করে মনোনয়ন দিলে আসনটিতে আবার আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলহাজ এম এ ওয়াহেদ বলেন, ব্যক্তিগত অবস্থান থেকেই আমি মানুষের সেবা ও সমাজের উন্নয়নে কাজ করে আসছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ও শেখ হাসিনার একজন বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা: কে বি এম হাদিউজ্জামান সেলিম বলেন, আমি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। স্বাচিপের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শিক কর্মী হিসেবে তিনি মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। আমি মনোনয়ন পেলে ভালুকার আসনটি আবারো জননেত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারব বলে বিশ্বাস করি।
বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কৃষকলীগের উপদেষ্টা ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শাহ আশরাফুল হক জজ বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ডিজিটাল দেশে পরিণত করেছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন সহযোগী হয়ে পাশে থাকতে চাই।
দু’বার নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম পিন্টু বলেন, দু’বার বিপুল ভোটে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। তিনি বলেন, জনপ্রিয়তায় শীর্ষে থাকা ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে নৌকা এবারো বিজয়ী হবে।
কেন্দ্রীয় কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান বিপ্লব বলেন, মইন উ আহম্মেদের সময়ে তিনি কারা নির্যাতিত হয়েছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দেবেন তাকে বিজয়ী করে নেত্রীকে নোকার এ আসনটি উপহার দিতে চাই।
চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা: এম আমান উল্লাহর ছেলে ঢাকা ল্যাবএইড হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জন ডা: মোনাসির সাকিফ আমান উল্লাহ বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা ভালুকা উপজেলার উন্নয়নে যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে আমি কাজ করতে চাই।
ঢাকা মনিপুরী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাৎ ইসলাম চৌধুরী মিন্টু জানান, তিনি ১৯৮৫ ও ১৯৯০ সালে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচন করে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মনিপুরী পাড়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহাম্মেদ বাচ্চু বলেন, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক দিয়ে আমার বিএনপির রাজনীতিতে হাতেখড়ি। বর্তমানে ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছি।
মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বর্তমানে ভালুকা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। ছাত্রদল দিয়ে তিনি বিএনপির রাজনীতি শুরু করেন। শিল্পনগরী হবিরবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিনি বিপুল ভোটে একবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর বাংলাদেশ চেয়ারম্যান ফোরামের মহাসচিব নির্বাচিত হন। আন্দোলন-সংগ্রামে তার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
জাতীয় পার্টি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হাফিজ উদ্দিন মাস্টার বলেন, দলের মনোনয়ন পেলে আধুনিক ভালুকা গড়তে আমি ভূমিকা রাখতে চাই।