জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের আগে আমার প্রতিটি স্টেপ একটা বিপদ শংকুল পথ দিয়ে পার হচ্ছিল, যেন খাদের কিনারে দাড়িয়ে আছি। সরকার নির্বাচনে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ এবং অস্ত্র ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার শর্তে জাতীয় পার্টি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পার্র্টি। ভোটের মাঠে এই শর্ত পূরণ না হলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার ( ২৩ ডিসেম্বর) দুপুরে নগরীর সেন্ট্রাল রোডস্থ দলীয় কার্যালয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকা রংপুর-৩ আসনের জন্য নেতা-কর্মীদের সাথে নির্বাচনী সভায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে সকাল পৌনে ১১টায় রংপুর মহানগরীর স্কাইভিউ বাড়ি থেকে বের হয়ে পল্লী নিবাসে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কবর জিয়ারত করেন জিএম কাদের। সেখান থেকে রংপুর কারামতিয়া মসজিদে নফল নামাজ শেষে মুন্সীপাড়া কবরস্থানে মা-বাবার কবর জিয়ারত করেন তিনি। পরে দলীয় কার্যালয়ে নির্বাচনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন। সেখানে নেতাকর্মীদের কাছে তিনি তুলে ধরেন নিজের আবেগের কথা। সেখানেই সাংবাদিকর সাথে কথা বলেন জিএম কাদের।
এ সময় তিনি খোলাসা করেন কেন এতদিন গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেননি।
জিএম কাদের বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে আমি সংবাদ মাধ্যমে আসি না। এটা নিয়ে অনেক ধরণের কথা শুনতে হচ্ছে আমাকে। সেকারণে আমি আজ সংবাদ মাধ্যমের সাথে কথা বলতে চাই। কেন আমি এতদিন কথা বলিনি, সেটাও বলতে চাই। আর কথা বলার জন্য রংপুরকে বেছে নেয়ার নিয়েছি। কারণ আমার মনে হয় এখানে আমি মায়ের কোলে বসে কথা বলছি। স্বস্তি,শান্তি এবং নিরাপত্বা ফিল করি আমি এখানে। স্বাচ্ছন্দ বোধ করি, সংকোচ হয় না। এখানে আমার সাথে মায়ের নিরাপত্বা আছে।’
জিএম কাদের বলেন,‘আমার কথা না বলার কারণ হলো বেশ কিছুদিন আমি কথা বলি নাই, কারণ আমি কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছিল এবং কি ভালো, কি মন্দ, কোনটা করা উচিৎ, কোনটা বর্জন করা উচিৎ এ রকম পরিষ্কার কোনো ধারণা পাচ্ছিলাম না। প্রতিদিন রাজনৈদিক পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছিল। এজন্য আমি কথা বলিনি।
আরেকটা কারণ হলো নির্বাচনে যাওয়ার আগে আমার প্রতিটি স্টেপ একটা বিপদ সংকুল পথ দিয়ে আমি পার হচ্ছিলাম। যেন একটা খাদের কিনার দিয়ে পার হচ্ছি। সেখানে রাষ্ট্রীয় অন্ধকার এবং ঝড়ঝঞ্জা চলছিল। সেখানে আমি যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ নেই, তাহলে হয়তো আমার অস্ত্বিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এজন্য আমি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেছিলাম, কোনটা করলে বা বললে ভালো হবে। এটা নিয়ে আমি চিন্তা করছিলাম। এ কারণে আমি কথা বলিনি।
নির্বাচনে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে করে জিএম কাদের বলেন,‘সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করতে আমাদের তিনটি শর্ত ছিল। তা হচ্ছে নির্বাচনে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ এবং অস্ত্রের প্রভাব ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত রেখে নির্বাচনকে সুষ্ঠু রাখতে হবে। সেই পরিবেশ নিশ্চিতে আমাদের শর্তে তারা রাজি হয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতেই তারা নিজের থেকে কিছু জায়গায় তারা নিজের প্রার্থী তুলে নিয়েছেন। এটা উঠিয়ে নেয়ার অর্থ এই নয় যে, আমরা মহাজোটে গেছি। অথবা আমরা আসন ভাগাভাগি করেছি। তাদের কোনো আসনে আমরা প্রার্থী উঠাই নাই। ওনারা যেখানে উঠিয়েছেন, সেখানে ওনাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং অন্যান্য প্রার্থী আছে। আমরা নির্বাচন করি জয়লাভ করার জন্য। আমরা শুধু পরিবেশটা চেয়েছি। নিরপেক্ষ যেন হয় সেটা চেয়েছি। আমরা চাই সরকারি প্রশাসনে যন্ত্রের নিরপেক্ষতা এবং সরকারি দলের পেশিশক্তি ও অর্থের ব্যবহার যেন নির্বাচনে ব্যবহার না হয় সেটার নিশ্চয়তা চেয়েছি।’
জিএম কাদের বলেন,‘প্রতিযোগিতা না থাকলে ভালো নির্বাচন বলা যায় না। এটার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব আমাদের হাতে ছিল না। আর কোনো চাপ আছে বলে আমি মনে করি না। নির্বাচনে যেহেতু গেছি, সব আশা আগ্রহ নিয়ে গেছি। আমাদের আশা, যটাই হোক, আওয়ামী লীগের ঝুকি নাই বললেই চলে, আমরা পার্টিসিফেট করেছি। জনগণ পার্টিসিফেট করবে কি না, সেটা তাদের ব্যাপার। তবে আমরা আমাদের রাজনীতি টিকিয়ে রাখার জন্য এই পর্যায়ে আছি। আমরা যদি মনে করি সেটা কার্যকর হচ্ছে না।’
ভোট বর্জন প্রসঙ্গে জিএম কাদের বলেন,‘আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাহলে সেটা পার্টির ফোরামে বসে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবো।’
জিএম কাদের বলেন,‘আমরা পার্লামেন্টে থাকার জন্য নির্বাচন করছি। আমরা কোনো ভাগ বাটোয়ারার নির্বাচন করছি না। এটা কোনো মহাজোট হচ্ছে না। বিভিন্ন দলের ধারণা তৈরি হয়েছে আমরা জোট করেছি। আমাদের ক্যান্ডিডেটরাও অনেকেই ভুল করছেন। এটা ইলেকশন কমিশনের দেখা উচিত ছিল। আমরা আগে মহাজোটে ছিলাম, কিন্তু এখন আর নেই। এই নির্বাচন মহাজোটের নির্বাচন হচ্ছে না। আমরা আওয়ামী লীগের সাথে সেই ধরনের কোনো চুক্তিও করিনি ‘
জিএম কাদের বলেন, দলের চেয়ারম্যান হিসেবে সারা বাংলাদেশে আমাকে যেতে হবে। আমি যদি আর মাঠে নাও আসি। তবুও আপানার সবাইকে নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাবেন। লাঙ্গল মার্কায় ভোট দিবেন। এই শহরের আমার শৈশব কৈশর ও যৌবনের সব দিন কেটেছে। আমি জীবিত থাকলেও আপনাদের সাথে আছি। মৃত্য হলেও আপনাদের সাথে থাকবো। আমার মৃত্যুর পর যেন আমার বাবা মায়ের কবরের পাশে দাফন হয় সেটি করার জন্য আমি আমার পরিবার ও নেতাদের বলেছি।‘
পার্টির মহাসচিবের নির্বাচনী পোস্টারে‘জাতীয় পার্টি মনোনীত ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত’ লেখা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি এটা চুন্নু করেনি। তার একজন ভক্ত ওই পোস্টার ছাপিয়েছে। যিনি ছাপিয়েছেন তিনি চুন্নুর ভক্ত এবং আওয়ামী লীগ করে। চুন্নু সাহেব ওই পোস্টার সরিয়ে নেয়ার জন্য তার ভক্তকে অনুরোধও করেছেন। আমাদের অনেক প্রার্থী এমন ভুল করেছেন।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, রংপুর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ও রংপুর-৩ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক এস এম ইয়াসিরের সভাপতিত্বে এসময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন দলটির কো-চেয়ারম্যান, রংপুর মহানগর ও জেলার সভাপতি এবং সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান, জেলার সদস্য সচিব ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী আব্দুর রাজ্জাক। বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মহানগরের সিনিয়র সহ সভাপতি লোকমান হোসেন, সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
সভায় জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক আজমল হোসেন লেবু, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা সদস্য শাফিউল ইসলাম শাফী, জেলা যুব সংহতি সভাপতি হাসানুজ্জামান নাজিম, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, মহানগর ছাত্র সমাজের সাবেক সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত আসিফ, সভাপতি আমিনুল ইসলামি ছোট, সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন জসিম, জেলা ছাত্র সমাজ আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক মাহবুবার রহমান বেলালসহ মহানগর, ওয়ার্ড ও জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড জাতীয় পার্টি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি রংপুর সদর উপজেলার পাগলাপীর, গঞ্জিপুর, হরিদেবপুর, লাহিড়ীর হাট মমিনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন এবং দলীয় কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন।
এ সময় মানুষকে তিনি ভোট কেন্দ্রে আনার জন্য নির্দেশনা দেন নেতা-কর্মীদের।
রংপুর সদর ও সিটি কর্পোরেশনের ৯ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ২৯৪ জন ও পুরুষ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে দু’জন।
রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের (লাঙল) ছাড়াও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আব্দুর রহমান রেজু (একতারা), বাংলাদেশ কংগ্রেসের একরামুল হক (ডাব), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সহিদুল ইসলাম (মশাল), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শফিউল আলম (আম) এবং তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী (ঈগল) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।



