ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি পাকা রাস্তার পাশে ও ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ১৫টি ইটভাটা। লাইসেন্সবিহীন এই ইটভাটাগুলো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত হয়ে আসছে। পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র না নিয়ে শুধু প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে সংরক্ষিত বনের কাঠ। ইটভাটাগুলোর প্রভাবে এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে ফসলি জমি ও পরিবেশ।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। এসব আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে জিগজ্যাগ ক্লিন, হাইব্রিড হফম্যান ক্লিন, বার্টিক্যাল শফট ক্লিন, টানেল ক্লিন ইত্যাদি। এ ধরনের কোনো প্রযুক্তি ছাড়া ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। আইনে আরো আছে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে, আবাসিক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, সংরক্ষিত বনভূমি ও জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকায়ও ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ ছাড়া সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেও কোনো ধরনের ইটভাটা স্থাপন করার সুযোগ নেই। এ আইনগুলো অমান্য করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। অথচ এসব আইন ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ভালুকায় এসব ইটভাটা পরিচালিত হচ্ছে।
এসব নিয়মনীতি পর্যবেক্ষণ ও ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান থাকলেও রহস্যজনকভাবে কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করছে। জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই অধিকাংশ ইটভাটার মালিক ফসলি জমির টপসয়েল কিনে এনে দেদারছে ইট তৈরি করছে। এতে করে এলাকার আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ গাছপালা।
উপজেলার ধলিয়া পলাশতলী গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পলাশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরপাশ ঘেঁষে আনিছুর রহমানের রিফাত ব্রিক্স, সোহাগ খানের আলসাফা ও জালাল উদ্দিনের সেবা নামের তিনটি লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা। রিফাত ইটভাটার চারপাশে মজুদ করে রাখা হয়েছে কয়েক শ’ মণ কাঠের লাকড়ি। ভাটার চিমনি দিয়ে প্রচণ্ড বেগে কুণ্ডলি পাকিয়ে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। আর সেই ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী পূর্ব ধলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা।
উপজেলার শান্তিগঞ্জ এলাকায় ইয়াসিনের এমবিবি ও সুলতান মিয়ার এমআরএল ব্রিক্স নামে দু’টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে দীপ্তি একাডেমি উচ্চবিদ্যালয় ও পার্শ্ববর্তী পাকা রাস্তা ঘেঁষে। এ ছাড়া ভালুকা-ত্রিশাল সীমান্তবর্তী বড়গাঁও গ্রামে ট্রিপল সেভেন, উড়াহাটি গ্রামে খিরু নদীর পাড়ে মনু মিয়ার এমএমআর ও ধলিয়া গ্রামে অবস্থিত দুলু চৌধুরীর মির্জা ব্রিক্স নামে ইটভাটাগুলোর চিত্রও একই। পলাশতরী গ্রামের কয়েকজন জানান, ইট পোড়ানোর কালো ধোঁয়ার প্রভাবে আশপাশের এলাকায় ফলজ বৃক্ষ ও শাকসবজিসহ কোনো ধরনের ফসলাদি ফলানো সম্ভব হচ্ছে না।
তা ছাড়া ভালুকার বিরুনীয়া, মেদিলা, উরাহাটি ও শান্তিগঞ্জ সাইনবোর্ড সড়কের পাশে বেশ কয়েকটি লাইসেন্সবিহীন ইটভাটা রয়েছে। এ দিকে গ্রামবাসীর প্রতিবাদের মুখেও পারুলদিয়া গ্রামের পূর্বপাশে মধূনী বিলের মাঝখানে নির্মিত হচ্ছে মনো মিয়ার আরো একটি ইটভাটা।
এ দিকে কার্পেটিং করা সরকারি রাস্তার ৫০০ মিটারের ভেতরে ভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও ভালুকা উপজেলার ভায়াবহ গ্রামে ভালুকা সখিপুর পাকা সড়ক ঘেঁষে অটো ব্রিক্স নামে একটি ইটভাটা পরিচালিত হয়ে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। নিয়ম ভঙ্গ করে সড়কের এত কাছে ভাটা স্থাপন করা হলেও রহস্যজনকভাবে তাদের রয়েছে পরিবেশের ছাড়পত্র।
খারুয়ালী, ধলিয়া, মেদীলা, মেদুয়ারী, ভায়াবহ, বিরুনীয়া, রাংচাপড়া, শান্তিগঞ্জ, চান্দরাটিসহ ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ১৫টি ইটভাটা। এসব ইটভাটার দু-একটি ছাড়া কোনোটিরই লাইসেন্স নেই। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ইটভাটায় শিশু ও নারী শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়। ইট তৈরিতেও করা হয় প্রতারণা। ইট তৈরিতে তাদের রয়েছে ছয়-সাত ধরনের ডাইস। তারা ইটের সাইজ ছোট-বড় করে প্রতিনিয়তই ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইটভাটার এক মালিক জানান, ভালুকার দু-একটি ছাড়া কোনোটিরই লাইসেন্স নেই। কিভাবে চলে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, প্রতিটি ইটভাটা থেকে ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারিকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়। এই সমিতিই ম্যানেজ করে থাকেন জেলা প্রশাসক ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের। উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন জানান, ভালুকায় ১৫টি ইটভাটা রয়েছে। তারা সব দিক ম্যানেজ করেই ভাটাগুলো পারিচালিত করে থাকেন।
এ ব্যাপারে ভালুকা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা ও কমিটির সদস্য হারুন অর রশিদ জানান, তার অফিসে ইটভাটার কোনো তালিকা আছে কি না, তা খুঁজে দেখতে হবে। যে সব ভাটায় লাকড়ি পোড়ানো হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানাবেন বলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান জানান, উপজেলার বেশির ভাগ ইটভাটারই লাইসেন্স নেই। এমনকি তারা নীতিমালারও কোনো তোয়াক্কা করে না। রহস্যজনক কারণে পরিবেশ অধিদফতর নির্বিকার। স্থানীয়ভাবে ইউএনও ও বন বিভাগ তদারকি করলে হয়তো কিছুটা প্রতিকার হতো।
ভালুকায় স্কুলের পাশে ও আবাসিক এলাকায় অবৈধ ইটভাটা
পোড়ানো হচ্ছে সংরক্ষিত বনের কাঠ
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি পাকা রাস্তার পাশে ও ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ১৫টি ইটভাটা। লাইসেন্সবিহীন এই ইটভাটাগুলো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই পরিচালিত...



