গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় প্রতি বছরের ন্যায় এবারো দিনব্যাপী আয়োজন করা হয়েছে সবচেয়ে বড় মাছের মেলা। যা এলাকায় জামাই মেলা হিসেবেও পরিচিত। উপজেলার জামালপুর, মোক্তারপুর ও জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নের মধ্যবর্তী বিনিরাইল গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এ মাছের মেলা বাংলা সনের মাঘ মাসের প্রথম দিন অনুষ্ঠিত হয়। মেলার দিনটিকে ঘিরে এখানে দিনব্যাপী চলে আনন্দ-উৎসব। দিনটির জন্য সারাটি বছর অপেক্ষায় থাকেন উপজেলাবাসী। কারণ, এ গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মেয়েরা মেলা উপলক্ষে তাদের স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। জামাইরা হচ্ছেন ওই মেলার মূল ক্রেতা ও প্রতিযোগী। তারা মেলার সবচেয়ে বড় মাছটি কিনে শশুর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার যেমন চেষ্টা করেন তেমনি শশুররাও চেষ্টা করেন বড় মাছটি কিনে মেয়ের জামাই ও নাতি-নাতনিদের আপ্যায়ন করাতে। বিনিরাইলের মাছের মেলা যেন জামাই-শশুরের বড় মাছ কেনার এক নিরব প্রতিযোগীতার মাঠ।
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশালের কুয়াকাটা থেকে আগত পাখি মাছ নামের এক শ্রেণির মাছ মেলায় আনা হয়েছে, যার ওজন ৭৩ কেজি ও লম্বায় ১১ ফুট। মাছ বিক্রেতা তার দাম হাঁকাইছে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা। যার দাম উঠেছে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার টাকা। মেলাকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। এছাড়াও গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে অনেক মানুষ কেবল মাছের মেলা উপলক্ষেই কালীগঞ্জে বেড়াতে আসেন। এবারের মেলায় প্রায় ৪ শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী বাহারি মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। মেলায় চিতল, বাঘাইড়, আইড়, রিডা, বোয়াল, কালিবাউশ, পাবদা, গুলসা, ইলিশ, গলদা চিংড়ি, বাইম, রূপচাঁদা, সুরমা, কোরাল, কাইক্কা, শাপলা, পোয়া ও টোনা-সহ বিভিন্ন প্রজাতি মাছের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে নানা রকম দেশী-বিদেশী মাছও। তবে মাছের মেলা হলেও এখানে আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি, পোষা পাখি ইত্যাদির পসরাও বসে।
মেলায় আসা মাছ বিক্রেতারা জানান, ‘তারা প্রায় ২৫ বছর যাবৎ মেলায় মাছ বিক্রি করতে আসেন। শুরুতে বেচা-কেনা ভালো হলেও বর্তমানে তেমন হয় না। তবে ঐতিহ্যের কারণে বিনিরাইলে মাছের মেলায় ক্রেতার চেয়ে দর্শকের সংখ্যাই বেশি।’
বিনিরাইলের মেলায় বেড়াতে আসা বক্তারপুর ইউনিয়নের ফুলদী গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল কালাম খান তুষার বলেন, ‘স্থানীয় জামাইদের নজর বিনিরাইলের মাছের মেলার বড় মাছটার দিকে। মাছ ব্যবসায়ীরা বড় বড় মাছ সংগ্রহ করে মেলায় নিয়ে আসেন। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী মাছের দাম হাঁকানো হয়। শুরুতে এ মেলা শুধুমাত্র হিন্দুধর্মাবলম্বীদের জন্য হলেও বর্তমানে এটা সকল ধর্মের মানুষের কাছে ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে।’
বিনিরাইল মাছের মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান খান (ফারুক মাষ্টার) প্রতিবেদককে জানান, ‘অগ্রাহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ সংক্রান্তির ও নবান্ন উৎসবের পর মেলাটি প্রথম প্রথম ক্ষুদ্র পরিসরে অনুষ্ঠিত হতো। প্রায় কয়েকশত বছর যাবৎ মেলাটির আয়োজন করে আসছেন এলাকার মুরুব্বিরা। আমাদের এলাকায় এ মেলাটি বর্তমানে একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিনত হয়েছে।’
স্থানীয়রা বলেন, ‘ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের মাছের মেলা এখন ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। মেলাটি কালীগঞ্জের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছে। মেলায় হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীর আগমন ঘটে থাকে। মাছের মেলাটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। মেলায় বেচা-কেনা যাই হউক না কেন, মেলাটি আমাদের কালীগঞ্জের ঐতিহ্য।’



