কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত লাবণী পয়েন্টের কাছাকাছি সি গার্ল হোটেলের পাশে কথা হয় ১৪ বছরের কিশোর সালমানের (ছদ্মনাম) সাথে। রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পাশের গ্রামের ছেলে। বাবা আরেকটি বিয়ে করে তিন ভাইবোন আর তাদের মাকে রেখে চলে গেছেন। তার আর দুই বন্ধু তারেক ও সেলিমের অবস্থাও এক। তাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে লিটনের। লিটন ফোন কেনার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার আরমবাগ থেকে এসেছে কক্সবাজারে। তাদের চারজনেরই বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। সি গার্ল হোটেলের পাশে সমুদ্রের ঝাউ বাগানে দেখা মিলল তাদের। বিকেলের ব্যস্ত সময়ে চার দিকে ভ্রমণপিপাসুরা যখন ছুটছেন সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে, তখন ঝাউ বাগানের কাছে একটি দেয়ালের নিচে বসে পলিথিনের ঠোঙায় ড্যান্ডি সেবন করছে এই চার শিশু। একটু পরই এক হাতে ড্যান্ডি টানতে টানতে রাস্তা পার হয়ে সি গার্ল হোটেলের পাশ দিয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে রওনা তারা। সেখানে পেয়ে যায় আরো কয়েক সঙ্গীকে। এরা সবাই একত্র হয় সমুদ্র সৈকতের লাবণী পয়েন্টে।
সেখানে কথা হলে লিটন জানায়, একদিন ট্রেনে উঠে কক্সবাজার স্টেশনে নামে সে। সব কিছুই অপরিচিত। কোথায় যাবে, কী খাবে কিছুই জানে না। হঠাৎ স্টেশনে ছোটবেলার বন্ধুর সাথে দেখা হয়। সেও ড্যান্ডি খায়, তাকেও খেতে বলে। প্রতিদিন একটা কৌটা কিনে ১২০ টাকায়। দিনে দুইবার হয়ে যায়। সমুদ্রে দেখতে এসে সমবয়সী আরো কয়েকজনের সাথে দেখা। এরাও ড্যান্ডি খায়। হয়ে গেল বন্ধুত্ব। লিটন বলে, ‘আমার এক বন্ধুর কিছু টাকা আছে। ভাবছি ওই টাকা দিয়ে মালা কিনব। তারপর তা বিক্রি কইরা যে টাকা পামু, তা দিয়ে মোবাইল কিনা বাড়ি যামু।’ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এলাকা ছাড়াও শহরের বিভিন্ন অলি-গলিতে ১৩ থেকে ১৪ বছরের শিশুরা নিয়মিত ড্যান্ডি সেবন করে। তাদের সবার হাতেই ড্যান্ডি ভরা পলিথিনের ঠোঙা।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা স্থানীয় শামসুল আলম বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মেয়েরা প্রকাশ্যে সিগারেট খায়, আর তাদের শিশু-কিশোরদের ড্যান্ডি সেবন করতে দেখা যায়। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি প্রয়োজন।
জানা যায়, আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ জন শিশু রয়েছে যারা প্রতিনিয়তই ড্যান্ডি সেবন করে। তারা চুরির ধান্ধায় থাকে। ধরা পড়লে পাবলিকের মারও খায়। তাদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। নেশার এ উপকরণের নাম ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যানড্রাইট আঠা, তবে ড্যান্ডি নামেই বেশি পরিচিত। ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ নামক আঠালো বস্তুটি (গাম) দিয়ে নেশা করে অসংখ্য পথশিশু-কিশোর। টলুইন সমৃদ্ধ এ অ্যাডহেসিভ মূলত ছোটখাটো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, ডিভাইস, চামড়া ও প্লাস্টিকের পণ্য জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। মূলত ড্যান্ডি আঠা ও ঘ্রাণযুক্ত এবং ঘ্রাণ থেকেই এক ধরনের আসক্তি হয়। এর ফলে এক ধরনের হ্যালোসিনেশনের মধ্যে থাকে সেবনকারি। ইদানীং কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন স্থানে হরহামেশায় দেখা মেলে ১৩-১৪ বছরের ছন্নছাড়া শিশুদের। তাদের অনেকের পরিবার নেই, আবার অনেককে বাবা-মা তাদের ফেলে গেছে। অনেকের বাড়ি আছে, আবার অনেকে সড়কেই থাকে। ভাঙাড়ি টুকিয়ে, কিংবা হাত পেতে দুমুঠো খাবার জোগাতে হয় তাদের। ক্ষুধার জ্বালা ভুলতে সড়কের এখানে-সেখানে বসে ড্যান্ডি খায় তারা।
রংপুর থেকে অনেক ছোট বয়সে মা-বাবার সাথে কক্সসবাজার এসেছিল জুয়েল (ছদ্মনাম)। কক্সবাজারে তাদের দুই ভাইকে ফেলে রেখে চলে যায় মা-বাব। বড় ভাই ভাঙাড়ি টুকিয়ে খাবার জোগাড় করেছে। ওকে বড় করেছে। এসব কেন খাও বলতেই জুয়েল বলে ‘একমুঠ ভাতের জন্য অনেক কষ্ট করছি। অনেক মানুষের মাইর খাইছি ভাই আর আমি। আমার বন্ধু বলছে, এটা খাইলে ক্ষুধা লাগে না। ওর কাছ থিকা খাওন শিখছি। ভাঙাড়ি টোকাইয়া বিক্রি কইরা হার্ডওয়্যারের দোকান থিকা ৮০ থেকে ১০০ আবার অনেক সময় ১২০ টাকায় বিক্রি করি। এটা খাইতে খাইতে যেদিকে মন চায় চলতে থাকি।’
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা ভ্রমণপিপাসু ও স্থানীয়রা সৈকত এলাকা ছাড়াও শহরের বিভিন্ন অলি-গলিতে ১৩ থেকে ১৪ বছরের ছন্নছাড়া শিশুদের ড্যান্ডি সেবন রোধে প্রশাসনের জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। উঠতি বয়সী শিশু কিশোরসহ শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় আছেন। তাই এ বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সচেতনমহল।
কক্সবাজারে ড্যান্ডি আসক্তিতে ধ্বংসের পথে পথশিশুরা
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত লাবণী পয়েন্টের কাছাকাছি সি গার্ল হোটেলের পাশে কথা হয় ১৪ বছরের কিশোর সালমানের (ছদ্মনাম) সাথে। রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পাশের গ্রামের ছেলে।...



