দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার নামে পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ কম সময়ে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া নৌ-রুট। দক্ষিণবঙ্গের মানুষ সহজে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের যাতায়াতের জন্য এই নৌ-রুট ব্যবহার করে থাকে। এই নৌ-রুট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন ও যাত্রী পারাপার হয়ে থাকে। পদ্মা সেতু চালু হবার আগে এই নৌ-রুটের যে পরিমাণ চাপ ছিল, এখন সেই চাপ না থাকলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০টি জেলা সহজে রাজধানীতে যাতায়াতের জন্য এই রুট ব্যবহার করে থাকে।
তবে এই নৌ-রুটে চলাচলকারী বেশিরভাগ ফেরিই ফিটনেসবিহীন এবং ৩০ থেকে ৩৫ বছরের পুরনো। আবার কোনো কোনোটির বয়স ৪৪ থেকে ৪৬ বছরও হয়ে গেছে। যার ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে নানা ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে চলাচলকারী অধিকাংশ ফেরির ফিটনেস নেই। আবার কুয়াশার মধ্যে ফেরি চলাচলের জন্য পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে যেসব ফগ লাইট বসানো হয়েছিল, সেটিও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শীত মৌসুমে রাতে ঘন কুয়াশার মধ্যেও নির্বিঘ্নে ২০১৬ সালে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি ফেরিতে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ফগ লাইট বসানো হয়। একেকটি সাত হাজার কিলোওয়াটের লাইট কিনতে ৫০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়। বলা হয়েছিল, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। অথচ কয়েক দিন পরই অধিকাংশ লাইট নষ্ট হয়ে যায়।
এই নৌরুটের খান জাহান আলী, শাহ আলী, কেরামত আলী, ভাষা শহীদ বরকত, কপোতি, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীন, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর, শাহ আমানত ও শাহ পরান ফেরিতে ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট বসানো হয়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে ছোট-বড় ১৬টি ফেরি চলাচল করে। এসব ফেরিত প্রতিদিন ১৭ থেকে ১৮ শ’ যানবাহন পারাপার হয়। কিন্তু কুয়াশার কারণে প্রতিদিনই ৩ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্তও ফেরি চলাচল বন্ধ থাকছে।
এসব কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে প্রায়ই নানা দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে একদিকে ঘটছে প্রাণহানি, অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ীরা।
বুধবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে কুয়াশায় আটকে থাকা ছোট ইউটিলিটি ফেরি রজনীগন্ধার তলা ফেটে পানি উঠে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটের অদূরে নয়টি ট্রাক নিয়ে ডুবে যায়।
ফেরিতে থাকা ট্রাকের চালক ও সহকারীদের অভিযোগ, ডুবে যাওয়া রজনীগন্ধা ফেরিটিরও ফিটনেস ছিল না।
এর আগে, ২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর ‘আমানত শাহ’ নামের একটি ফেরি ১৭টি যানবাহন নিয়ে দৌলতদিয়া থেকে ছেড়ে পাটুরিয়ার উদ্দেশ্য গেলে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটের কাছে ডুবে যায়। সেই ফেরিও ফিটনেসবিহীন ছিল। ফেরিটি প্রায় ৪১ বছরের পুরাতন ছিল। সর্বশেষ ২০১২ সালে ডকিং মেরামত হয়েছিল ‘আমানত শাহ’ ফেরিটির। এরপর থেকে কোনো ফুল ডকিং করা হয়নি। এছাড়া কোনো সার্ভে সার্টিফিকেট ছিল না ফেরির। ফলে ফেরিটি চলাচলের অনুপযুক্ত ছিল।
জানা গেছে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটের অধিকাংশ ফেরির বয়স ৩৫ বছরের বেশি। রজনীগন্ধার বয়স ছিল ৪৭ বছরের বেশি। রোরো ফেরি ‘খান জাহান আলী’ তৈরি হয় ১৯৮৭ সালে। আরেক রোরো ফেরি ‘কেরামত আলী’ ৩৬ বছরের পুরনো। ‘বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর’ ফেরি তৈরি হয় ১৯৯২ সালে।
বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, এই সংস্থার আওতাধীন ৫৩ ফেরির মধ্যে ৪৭টিরই সনদ নেই। বেশিরভাগ ফেরি ৪০ বছরের বেশি পুরাতন। এছাড়াও ১৮টি রোরো ফেরির (বড় ফেরি) মধ্যে ১৪টিরই ফিটনেস সনদ নেই। এছাড়াও নেই বেশির ভাগ ফেরিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি। অনেক ফেরির বয়স ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী ৪০ বছরের বেশি বয়সী নৌ-যানের ফিটনেস সনদ দেয় না বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন অধিদফতর। তারপরেও চলছে ফেরি সার্ভিস। ফলে মাঝেমধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা।
কয়েকজন ফেরি মাস্টার জানান, ‘প্রতিটি ফেরির বয়স ৩৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। নাব্যতা সঙ্কটের কারণে ধীরে ধীরে চললেও কুয়াশার কারণে প্রতিদিনই ৩ থেকে ১২ ঘণ্টা ফেরি বন্ধ রাখতে হয়। ফগ লাইট লাগানো হলেও তা কাজে আসেনি। নদীপথ অস্পষ্ট হয়ে গেলেই ফেরি বন্ধ করে দেয় ঘাট কর্তৃপক্ষ। অথচ কোটি টাকা খরচ করে এই কুয়াশার কারণে ফেরিতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফগ লাইট লাগানো হয়েছিল, যা কোনো কাজেই আসছে না।’
গত ১৭ জানুয়ারি রজনীগন্ধা ফেরি ডুবির দুর্ঘটনার দিন ওই ফেরির আরোহী ছিলেন ট্রাকচালক আশিক। তিনি বলেন, ‘ফেরিটির কোনো নৌ-যানের সাথে ধাক্কা লাগেনি। তলা দিয়ে পানি ঢুকে কাত হয়ে নয়টি ট্রাক নিয়ে ডুবে যায়। ফেরিটি অনেক পুরাতন ও ফিটনেসবিহীন ছিল। এছাড়াও ফেরি কর্তৃপক্ষ অবহেলার কারণে রজনীগন্ধা ফেরিটি ডুবে যায়।’
রজনীগন্ধা ফেরি ডুবির প্রত্যক্ষদর্শী আরেক ট্রাকের চালক মজনু বলেন, ‘রাতে দৌলতদিয়া থেকে রওনা হবার পর মাঝ নদীতে এসে কুয়াশার কারণে ফেরি নোঙর করে রাখা হয়। পরে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ফেরিতে পানি উঠতে থাকে। এ সময় ফেরির লোকজন পানি নিষ্কাশন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।’



