ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার পাড়াগাঁও গ্রামে সম্প্রতি বন বিভাগের রোপণকৃত বিভিন্ন প্রজাতীয় কয়েক হাজার গাছের চারা উধাও হয়ে বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে চার হেক্টর জমি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এমনকি ডিবিএল কোম্পানির পক্ষে জমি দখলের উদ্দেশ্যে রাতের আঁধারে চারাগুলো ধ্বংস ও কৌশলে মেরে ফেলা হয়েছে। অপর দিকে হবিরবাড়ি মৌজায় বনায়নকৃত শত শত চারা ধ্বংস করে জবরদখলের পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের লাখ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে বন বিভাগ জানায়।
বন বিভাগ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার পাড়াগাঁও মৌজার ৪৮৩ নম্বর দাগে সীমানা নির্ধারণ করে প্রস্তাবিত ও নির্মাণাধীন ডিবিএল কোম্পানির দখলে থাকা ৪ হেক্টরসহ আশপাশের অবৈধ দখল করা ১০ হেক্টর বনভূমি উদ্ধার করে সম্প্রতি আকাশমণি, শাল, চিকরাশি, চালতা, শীল কড়ই, আম, কাঁঠাল, আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, লইপাই ও জামের ২৫ হাজার চারা রোপণ করে। এমনকি জমির পাশে রহস্যজনক কারণে বন বিভাগের দাবিকৃত দাগনম্বর উল্লেখ না করে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করে। কিন্তু অভিযুক্ত কোম্পানি জমি দখলের উদ্দেশ্যে রাতের আঁধারে রোপণকৃত সবগুলো চারা কৌশলে উপড়ে ফেলে এবং পূর্বপাশে সিমানাপ্রাচীর নির্মাণ শুরু করে। খবর পেয়ে বন বিভাগের লোকজন কাজে বাধা দিয়ে আসে। এ দিকে আদালতে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও পৈতৃক সূত্রে পাওয়া স্থানীয় নলিত চন্দ্র বর্মণের কিছু জমি দখলে নিয়ে ওই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছে বলে জমি মালিকের অভিযোগ।
জমির মালিক বিন্দুবাসি বর্মণের ছেলে নলিত চন্দ্র বর্মণ জানান, পাড়াগাঁও মৌজার ৩৩৯ ও ৩৪২ নম্বর দাগে তাদের এক একর ৯০ শতাংশ জমি রয়েছে। তিনি ডিবিএল কোম্পানির কাছে কোনো জমি বিক্রি করেননি। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি জালজালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করে ওই কোম্পানির কাছে তার কিছু জমি বিক্রি ও জবরদখল করে নেয়। এ ঘটনায় তার ৩৫ শতাংশ জমি জবরদখলের অভিযোগে আদালতে মামলা করার পরও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আদালতের সিদ্ধান্তকে আমলে না নিয়ে সীমানাপ্রাচীর করে ফেলেছে। তা ছাড়া তার জমির পাশে ৪৮৩ নম্বর দাগে বন বিভাগের জমি দখল করেও কোম্পানির লোকজন সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছেন। এমনকি জমি দখলের উদ্দেশ্যে কিছ ুদিন আগে বন বিভাগের লাগানো কয়েক হাজার গাছের চারা উধাও করে বিরান ভূমি বানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, সোহাগ ও জিহাদসহ কিছু ব্যক্তি বন বিভাগের সাথে যোগসাজশ করে ডিবিএল কোম্পানির পক্ষে জমি দখলসহ সীমানাপ্রাচীর ও স্থাপনা নির্মাণে সহযোগিতা করে আসছেন।
ডিবিএল কোম্পানির ম্যানেজার মো: জামান জানান, স্থানীয় নলিত চন্দ্র বর্মণ কোম্পানির বিরুদ্ধে আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। জমির বিষয়টি তার জানা নেই। যিনি ওই বিষয়টি দেখেন, তার নম্বর যোগার করে কথা বলতে পারেন।
অপর দিকে হবিরবাড়ি মৌজার ১৫৪ নম্বর দাগে আমতলী মোড় এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন প্রভাবশালীদের জবরদখলকৃত প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের সাড়ে পাঁচ একর বনভূমি উদ্ধার করে বন বিভাগ দুইবার বনায়ন করে। কিন্তু পুনরায় জবরদখলের উদ্দেশ্যে দুইবারই রোপণকৃত চারাগুলো রাতের আঁধারে তুলে ফেলা হয়। সম্প্রতি আবারো ওই জমিতে আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতীয় সাড়ে পাঁচ হাজার চারা রোপণ করে দুইজন পাহারাদার নিয়োগ করে। কিন্তু ওই চক্রটি পুনরায় অসৎ উদ্দেশ্যে রাতের আঁধারে বেশ কিছু চারা উপড়ে ফেলে।
বন বিভাগ কর্তৃক নিয়োগকৃত বাগানের পাহারাদার লবণকোঠা গ্রামের আবুল কাশেম ও জিয়াউর রহমান জানান, নাজমুল নামে এক ব্যক্তি তাদের প্রায়ই ভয়ভীতিসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে আসছেন বাগানের দায়িত্ব থেকে সড়ে যাওয়ার জন্য।
ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ি বিট অফিসার আশরাফ উদ্দিন খান জানান, হবিরবাড়ি মৌজার ১৫৪ নম্বর দাগে মোট জমি রয়েছে ২৯৪ একর ৩০ শতাংশ। তার মাঝে বন বিভাগের রয়েছে, ২০১ একর ৫০ শতাংশ, যা ২০ ধারায় গ্যাজেটভুক্ত। সম্প্রতি ওই দাগে জবরদখলকৃত সাড়ে পাঁচ একর বনভূমি উদ্ধার করে বিভিন্ন প্রজাতীয় সাড়ে পাঁচ হাজার চারা বনায়ন করা হয়। পরে বাগান দেখাশোনার জন্য পাহারাদার নিয়োগ করা হলেও রাতের আঁধারে ওই চক্রটি পুনরায় জবরদখলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও কৌশলে চারাগুলো ধ্বংস করে চলেছে। জবরদখল ঘটনায় আগেও বন আইনে মামলা ছিল। হুমকি-দমকির বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
এ ব্যাপারে ভালুকা রেঞ্জের কাদিগড় বিট অফিসার আনোয়ার হোসেনের সাথে তার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার চেষ্টা করলেও রিসিভ না করায় তার বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে রেঞ্জ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ জানান, ডিবিএল কোম্পানি কর্তৃক জবরদখলকৃত চার হেক্টর জমিসহ আশপাশের মোট ১০ হেক্টর বনভূমি উদ্ধার করে তাতে ২৫ হাজার বিভিন্ন প্রজাতীয় গাছের চারা রোপণ করে বনায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে বেশির ভাগ চারা মারা যায় ও কৌশলে উধাও করে দেয়া হয়। তা ছাড়া বন বিভাগের জমি দখলে নিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের অভিযোগে ও চারা ধ্বংসের অভিযোগে কোম্পানিসহ স্থানীয়ভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে পৃথক পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।