এক সময় খেলাধুলা, বিনোদন কিংবা খবরাখবরের একমাত্র জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল বেতার রেডিও। কালের পরিক্রমায় ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এটি আজ হারিয়ে গেছে। গ্রামে-গঞ্জে কোথাও এখন আর দেখা মিলেছে না ওই বেতার যন্ত্র রেডিওর। মূলত : রেডিও হলো ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা হচ্ছে বেতার। এক সময় গ্রাম-গঞ্জের প্রতিটি মানুষের কাছে রেডিওর কদর ছিল। দেশ-বিদেশের খবরাখবর, সঙ্গীত, বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান শুনতে রেডিও ছিলো তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। কিন্তু বিজ্ঞানের অত্যাধুনিক আবিষ্কার ও মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতায় বর্তমানে রেডিওর কদর নেই বললেই চলে।

সরেজমিনে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দেখা গেছে, কারো কাছেই সচল রেডিও নেই। কিছু কিছু ঘরে রেডিও থাকলেও তা আজ বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে আবার পরম যত্নে সাজিয়ে রেখেছেন শোকেজে।

সূত্র মতে, মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ছিল বিশ্ব রেডিও দিবস। বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে সুদূর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগসূত্র স্থাপনে এই বেতার যন্ত্রের আবিষ্কারের সাথে অনেক বিজ্ঞানীর নাম জড়িয়ে থাকলেও রেডিওর আবিষ্কারক হিসেবে ইতালীয় বিজ্ঞানী গুয়েলমো মার্কনির নামই সবার মুখে মুখে। কারণ, বিংশ শতকে তিনিই প্রথম দূরের সংযোগকে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে জুড়া লাগিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় রেডিওকে স্যালুট জানাতে ২০১১ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব রেডিও দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। এই দিনটিকে বাছাই করা হয়েছিল কারণ, ১৯৪৬ সালে এই দিনেই জাতিসঙ্ঘ রেডিও প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রচার করেছিল। স্পেনের রেডিও অ্যাকাডেমি ২০১০ সালে প্রথম ১৩ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব রেডিও দিবস হিসেবে উদযাপন করার পরিকল্পনা করেছিল। তারপর ২০১১ সালে ইউনেস্কো ১৩ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব রেডিও দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

জানা যায়, আগের দিনে নানা অনুষ্ঠান, বিনোদন ও খেলার বিবরণী ছাড়াও আবহাওয়া, রাজনৈতিক বিভিন্ন ধরনের খবরাখবর শোনার একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও। বিশেষ করে উপকূলবাসীদের আবহাওয়ার খবর জানার প্রধান যন্ত্র ছিল এটি। এছাড়া জেলে সম্প্রদায় যারা গভীর সাগরে মাছ আহরণে যেতেন তারা আবহাওয়ার খবরের জন্য এই রেডিও ব্যবহার করতো। এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেয়া হতো এটি। প্রাচীনকালে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়ো-বৃদ্ধদের কাছে রেডিও বেশ জনপ্রিয় ছিল। তরুণ-তরুণীরা বেশিরভাগ সময় নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত, গানের ডালি, দূর্বার, সুখি সংসার, দর্পণ, বাংলা ছায়াছবির গান, ম্যাগাজিন ও নাটক শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। কিন্তু আধুনিক যুগে মোবাইল, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের কারণে রেডিও এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। বর্তমান মোবাইলের কারণে রেডিওর জনপ্রিয়তা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো কেউ রেডিও শোনেন না।

ধূলজুরী গ্রামের সকত আলী জানান, ‘শীতের রৌদ্রে বাশেঁরপাটি বিছিয়ে রেডিও শুনার অনুভূতি ভোলার মতো না। তখন খবর শুনতাম, পল্লীগীতি শুনতাম। এখন তো টিভি কিংবা মোবাইলেই সব আছে।’

সাবেক প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘ছোটকাল থেকে বিভিন্ন বিষয়ে যা কিছু জানা সবই ছিল এই রেডিওর মাধ্যমে। রেডিওর প্রচলন শুরুর পর প্রায় ঘরে ঘরে জায়গা করে নিয়েছিলো এই রেডিও। বাজারে এখন রেডিও পাওয়া দুষ্কর। শত দোকান খুঁজলেও এখন আর রেডিও পাওয়া যায় না।’

তিনি আরো বলেন, দিন দিন হারিয়ে যাওয়া রেডিও আগামী প্রজন্মের কাছে শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে বইয়ে পেলেও বাস্তবে রেডিওর দেখা মিলতে পারে বিভিন্ন জাদুঘরে।