গাজীপুরের কালীগঞ্জে অবৈধভাবে প্রকাশ্যে ফসলি জমির মাটি কাটার মতো কর্মযজ্ঞ চালছেই। প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ায় কৃষি জমিগুলো পরিণত হচ্ছে ডোবায়। এতে করে ফসলি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, বেকার হয়ে পড়ছে সাধারণ কৃষক। জানা যায়, এ উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের মালিবন্দ এলাকায় ভেকু দিয়ে মাটি কাটছে দক্ষিণ সোম গ্রামের আল মেহেদী ও আকবর সিন্ডিকেট।
সরেজমিন দেখা যায়, লড়ি দিয়ে মাটি পরিবহনের কারণে উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের মালিবন্দ, ফিরিন্দা, টিওরী, সানাইয়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা যেন ধুলাবালুর কুয়াশায় ডেকে গেছে। অসহায় জীবন যাপন করছে সাধারণ জনগণ। মাটি পরিবহনে ভারী ট্রাক ও লড়ি ব্যবহার করায় গ্রামীণ সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত। কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বসিয়ে ভেকু ও ড্রাম ট্রাক আটক এবং মাটিখাদকদের অর্থদণ্ড দিলেও থামেনি ফসলি জমির মাটি কাটার এই মহাযজ্ঞ।
উপজেলা প্রশাসনিক দফতর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই চলছে এই মাটি কাটার ধুম। এত দিন প্রকাশ্যে দিনের বেলায় মাটি কাটলেও প্রশাসনের অভিযানের পর এখন রাত ১০টার পর মাটি কাটা শুরু করছে তারা।
সম্প্রতি উপজেলার পৌর এলাকার দুর্বাটি গ্রামের নুরুল আলম আকন্দকে কৃষি জমিতে পুকুর খননের অভিযোগে ৫০ হাজার, তুমলিয়া ইউনিয়নের আরা ও মালিবন্দ এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই ব্যবসায়ীকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, বাহাদুরশাদী ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের ছেলে ছলিমউল্লাহকে এক লাখ টাকা, দক্ষিণবাগ গ্রামের আরিফুল ইসলামের ছেলে নাদিমকে ৫০ হাজার, বালীগাঁও গ্রামের মৃত রকিব আলীর ছেলে সাইফুল ইসলামকে ৫০ হাজার টাকা জারিমানা করা হয়। এ ছাড়া, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী উত্তরসোম গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে বিজয় মিয়াকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে হাফছা নাদিয়া।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কালীগঞ্জের নিকটবর্তী নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রায় ২০টি ইটভাটা রয়েছে। উৎপাদিত ইটের কাঁচামাল হিসেবে প্রায় ৭০ শতাংশ মাটি সরবরাহ হয় কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ফসলি জমি থেকে। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এর সাথে জড়িত রয়েছেও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, ভূমিদস্যুরা জমির মাটি ভেকু দিয়ে ১০-১২ ফুট গভীর করে খাড়াভাবে কাটে, যাতে করে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে পার্শ্ববর্তী জমির মাটি ভেঙে পড়ে ওই জমির ওপর।
সরকারি গেজেটে মাটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাসকরণ ২০১৩ সালের ৫৯ নং আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি হতে মাটি কাটা বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। যদি কোনো ব্যক্তি আইনের এই ধারা লঙ্ঘন করেন তাহলে, তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুর রহমান জানান, কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার অপরাধে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ভ্রাম্যমণ আদালত বসিয়ে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানের সময় ভেকু ও ড্রাম ট্রাকের চালক পালিয়ে যাওয়ায় গাড়ির ব্যাটারি খুলে জব্দ করা হয়েছে। কৃষিজমির মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের একাধিক টিম রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে।



