ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতি নদীর কোলঘেষে ছোট্ট একটি গ্রামের নাম ‘নতুন বান্দুরা’। এই গ্রামেই জন্ম রতন রাজবংশীর। বয়স ৫০ ছুঁইছুই। বংশ পরম্পরায় রতন রাজবংশী মাছ আহরণের সাথে জড়িত। ইছামতি নদীকে কেন্দ্র করে প্রায় শতাধিক জেলে পরিবারের বসবাস এখানে। ৪০ বছর ধরে ইছামতির সাথে শখ্যতা গড়ে উঠেছে তার। এক কথায় নদী আবর্তিত রতনের জীবন এবং জীবিকা।

কৈশোরে পা ফেলার আগেই ১০ বছর বয়সে মাকে হারান রতন রাজবংশী। কম বয়সে মাকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন। মায়ের অনুপস্থিতি তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। অস্থির হয়ে উঠে তার ছোট্ট মনটা। কীভাবে এই কষ্ট দূর করবেন? মমতাময়ী মায়ের মুখখানি বার বার ভেসে উঠে। মায়ের কষ্ট ভুলে থাকতে এক সময়ে ইছামতি নদীকে আপন করে নেন তিনি। মাছ শিকার, মাছ বিক্রি করে আর নদীর জলের সাথে মিতালী করে রতনের দিন কাটতে লাগল!

রতন রাজবংশীর মতো মাছ শিকার করে হাজারো পরিবারের খাবার যোগাড় হতো এ নদী থেকে। তবে সময়ের ব্যবধানে ইছামতি তার রূপ পাল্টিয়েছে! এক সময়ের ইছামতি এখন মরা নদীতে পরিনত হয়েছে। হারিয়েছে স্বাভাবিক নাব্যতা, দূষণ আর দখলে নাস্তানাবুদ! কচুরিপানাও গ্রাস করেছে ছলাৎ ছলাৎ চলার ছন্দ। তবুও অবলা ইছামতি নদী জানান দেয় তার অপারগতা। ভরা বর্ষায় নদীতে পানি থাকলেও গ্রীষ্মে যেন মরা খাল। এ সময়টাতে নদীর কোথাও যেন পর্যাপ্ত পানি নেই, পানি শুকিয়ে মাঝকুল জেগে উঠেছে। নদীর পাড়ে গড়ে উঠা হাট-বাজারের যত আবর্জনা এখন নদীতেই ফেলা হচ্ছে। এমনকি ক্লিনিকের বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে।

এসব কারণে গত কয়েক বছর ধরে উৎসব ছড়ানোর মতো নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হতে পারছে না। সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেনি কেউ। দূষণের ফলে এখন মাছ শিকারের মতো পেশা হারিয়ে বেকার অনেকে। আবার কেউ বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলে সংসার চলছে না এ আয় থেকে। যে জন্য জেলে পরিবারের অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছে। রতন রাজবংশী এ নদীতে মাছ শিকরের আয় থেকেই দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন দিনরাত পরিশ্রম করেও সংসার চালাতে পারছেন না।

নতুন বান্দুরা গ্রামের গোবিন্দ সরকার নামে আরেক জেলে জানান, এখানকার পানি দূষিত হয়ে মাছ শিকারের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। পানি থেকে ভীষণ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোনো কিছু করতে না পেরে পেটের দায়ে এখানে পড়ে থাকি। ঢাকা থেকে নদী পথে পণ্য আনা নেয়া হতো এ নদী দিয়েই। পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সেটাও বন্ধ হয়ে গিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ।

দেওতলা গ্রামের মাসুদ মোল্লা জানান, এ নদীকে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কাশিয়াখালীতে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেই বাঁধের মুখ খুলে দিতে হবে তাহলে সরাসরি পদ্মা থেকে পানি প্রবেশ করতে পারবে।

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের সোনাবাজু ও দোহার উপজেলার কার্তিকপুর এ দুই অংশের পদ্মা নদী থেকে ইছামতির উৎপত্তি আর মিশেছে কালিগঙ্গা ও ধলেশ্বরীতে গিয়ে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে এক সময় ঢাকার সদরঘাট থেকে বান্দুরা লঞ্চ চলাচল করতো। আর দেশ স্বাধীনের আগে সদরঘাট থেকে কার্তিকপুর হয়ে রাজবাড়ির দৌলতদিয়া পর্যন্ত মালবাহী স্টিমার চলাচল করতো। সবশেষ নব্বইয়ের দশকেও এ নদীতে লঞ্চ চলাচল করতো। কিন্তু নাব্যতা কমে যাওয়ায় বন্ধ হয় লঞ্চ সার্ভিস।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালে নবাবগঞ্জের কাশিয়াখালী সোনাবাজু এলাকায় পদ্মার সংযোগস্থলে বাঁধ দেয়া হয়। আর স্বাধীনের পর পরই কার্তিকপুরে নদীর মুখ বন্ধ করে নির্মাণ করা হয় সড়ক। যে কারণে পদ্মা নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ইছামতি। সেই সময় থেকে ইছামতি নদী অস্তিস্ত সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে।

এই নদীর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য স্থানীয় সামাজিক বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে, তা সত্ত্বেও কেন জানি কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি এতদিনেও।

ইছামতি নদী বাঁচাও আন্দোলন, নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষার মতো একাধিকবার নদীকে বাঁচানোর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে অবগত করে আসছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি এক যুগের বেশি সময় ধরে।

এ বিষয়ে নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা জানান, ইছামতি রক্ষায় কাজ করছে কয়েকটি সামাজিক সংগঠন। প্রতি বছরই দখল দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য মানববন্ধনসহ বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আলোচনা করে আসছে। উপজেলার প্রশাসনের কাছে একাধিকবার স্মারকলিপি প্রদান করেছে। কচুরিপানার জন্য নৌকা বাইচের মতো উৎসব হতে পারছে না এ নদীতে। ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমানের কাছে আমাদের দাবি, তিনি যেন দ্রুত ইছামতির নদী রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম সোহেল জানান, ইছামাতি নদী সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আশা করি, খুব শিগগিরই আমরা ভালো কিছু করতে পারব।