যশোরের চৌগাছায় ফসলে অতিমাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। এতে নদীনালা, খাল, বিল, হাওর-বাঁওড়ের মতো মুক্ত জলাশয়ে দেশী প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। গ্রামগঞ্জের খাল-বিলে কিছু দেশী মাছ মিললেও মানুষের চাহিদার থেকে তা অপ্রতুল। প্রতিনিয়ত কৃত্রিম উপায়ে বিল-বাঁওড়, ঘের-পুকুরে মাছের চাষ বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত স্বাদ বিনষ্ট হচ্ছে। মাছ চাষসহ ফসলিজমিতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মাছের জীবনচক্র ব্যাপকভাবে বিপদগ্রস্ত।

সরেজমিন শুক্রবার উপজেলার চৌগাছা, পুড়াপাড়া, খড়িঞ্চা, মাশিলা, কচুবিলা, চাঁদপাড়া, সলুয়া, সিংহঝুলি, পাশাপোল, ধুলিয়ানী, খলশি, পাতিবিলা, হাকিমপুর, নারায়ণপুর, ফতেপুর ও আড়পাড়া মাছ বাজারে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন প্রজাতির চাষের মাছে বাজার ভরে গেছে। উল্লেখযোগ্য বিদেশী রুই, কাতলা, চিতল, কৈ, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস ও কার্প প্রজাতির মাছের আমদানিই বেশি। দেশী মাছ খোঁজ করলে কয়েকজন মৎস্যজীবী অল্পসংখ্যক মাছ ঝুড়িতে নিয়ে বসে আছেন। আর যে দাম চাচ্ছেন তা নিম্নবৃত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। বিক্রেতার দাবি এসব ছোট মাছ এখন পাওয়াই যায় না। সারাদিন মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

চৌগাছা বাজারে মাছ বিক্রেতা রমেন হালদার বলেন, একসময় আমরা বেড়গবিন্দপুর সরকারি বাঁওড়, মর্যাদ সরকারি বাঁওড়, খড়িঞ্চা সরকারি বাঁওড় ও বল্লভপুর সরকারি বাঁওড়, মাধবপুর বাঁওড় ও কপোতাক্ষ নদ ও ভৈরব নদ থেকে দেশী মাছ ধরে তা বাজারে বিক্রি করে সংসার চালিয়েছি। বর্তমানে বাঁওড়গুলো ব্যক্তিমালিকানায় লিজ দেয়ায় সেভাবে আমরা দেশী মাছ ধরতে পারি না। তা ছাড়া সরকারি এসব বাঁওড় লিজকারীরা কার্প জাতের মাছ চাষে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মাছের জীবনচক্র ব্যাপক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বাজারে দেশী মাছের চাহিদা থাকলেও এ ধরনের ঝিয়া, কাকীলা, বেলে, বাইন, পাকাল, গুতেলগচি, মায়া, চিংড়ি, চ্যাং, দেশী মাগুর, পাবদা, পুঁটি, টেংরা, খলিশা, শিং, রইনাসহ এ ধরনের মিঠাপানির মাছ জন্মাচ্ছে না।

বেড়গবিন্দপুর গ্রামের মৎস্যজীবী নিমাই হালদার জানান, দেশী মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে আগে প্রাকৃতিক জলাশয়, মাছ সংরক্ষণ এবং মৎস্য পরিবেশবান্ধব নীতি ও অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। আর বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মোট প্রায় ২৫০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে ১২টি চরম বিপন্ন এবং ১৪টি সঙ্কটাপন্ন। যদিও চিংড়িসহ ২৯০টি মিঠাপানির মাছ এবং ৫১০টি সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলে মাছের যে প্রাকৃতিক জলাশয়, মুক্ত জলাশয় রয়েছে, তা আমাদের অযাচিত ও অনৈতিক ব্যবহারের কারণে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তারকে হুমকির সম্মুখীন করছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার বলেন, বর্তমানে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্র, চলাচল অনেকখানি হুমকির মুখে। আমরা না জেনে, না বুঝে জাটকা নিধন করি। তা ছাড়া জমিতে অতিমাত্রায় বালাইনাশক প্রয়োগ, অপরিকল্পিত বাঁধ দেয়া, পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন এবং মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা থেকে বিরত না থাকায় এখন আর পরিচিত অনেক দেশী মাছের সন্ধান মেলে না।