গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুর আনসার ভিডিপি একাডেমিতে হামলা, পুলিশ বক্স-আ’লীগের অফিস ও যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে শতাধিক ছাত্র-জনতা।
রোববার (৪ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা সফিপুর আনসার ভিডিপি একাডেমির সামনে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকার একপর্যায়ে আনসার একাডেমির অব্যন্তরে থাকা শেখ মজিবুর রহমানের ভাষ্কর্যের ওপর রড-শাবল নিয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এতে আনসার একাডেমির অভ্যন্তর থেকে আনসার সদস্যরা বাধা দেয় এবং পরে পুলিশ গিয়ে আনসারদের সাথে যোগ দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার সেল, রাবার বুলেট এবং আনসাররা গুলি বর্ষণ করলে শতাধিক ছাত্রজনতা আহত হয়। আহতদের সফিুর বাজারের তানহা জেনারেল হাসপাতাল ও কালিয়াকৈর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগসহ টেলিফোন বা মোবাইল ফোন কেউ রিসিভ না করায় এ ব্যাপোরে তথ্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা, কালিয়াকৈর বাজার এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও স্থানীয় আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে সরকারী বিরোধী নানা শ্লোগানে বিক্ষোভ মিছিল করে। কিন্তু সকাল ১০টার দিকে ওই মহাসড়কের চন্দ্রা এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অংগ সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী ক্ষিপ্ত হয়ে আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে। এ খবর অন্য শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা চন্দ্রা ত্রিমোড়ে জড়ো হয়। এ সময় অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা ওই এলাকায় থাকা কালিয়াকৈর পৌর আওয়ামী লীগের অফিস, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশসহ তিনটি পুলিশ বক্স আগুন দেয়। এ সময় তারা বেশকিছু যানবাহন ভাঙচুর করে। পরে আন্দোলনকারীরা বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার লতিফপুর এলাকায় থানা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। এ সময় উপজেলা চত্বরের ভেতরে ও কালিয়াকৈর থানার সামনে থাকা পাঁচ-ছয়টি যানবাহনে আগুন দেয় এবং যানবাহন ভাঙচুর করে ছাত্র-জনতা। পরে পুলিশ ধাওয়া দিলে আন্দোলনকারীদের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় কালিয়াকৈর থানার অফিসার (ওসি) এএফএম নাসিম গুরুতরসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। থানার দুই পাশে অবস্থানরত ছিল আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার আহম্মেদ হাত মাইক নিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে শান্ত করেন।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ দুরত্বে সরিয়ে দেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা থানা থেকে চন্দ্রার দিকে কিছু দুরে পৌঁছলে অপরদিক থেকে প্রায় একব থেকে দেড়শত পুলিশ এসে শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল, সাউন্ডগ্রেনেড, রাবার বুলেট ছুঁড়ে। এতে সাত বছরের এক শিশুসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান অন্য শিক্ষার্থীরা। খবর পেয়ে দেড়টার দিকে আবারো উপজেলা চত্বর ও থানার সামনে জড়ো হয় আন্দোলনরতরা। পরে পুলিশ গুঁলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলোর শব্দে ওই এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ‘অসহযোগ আন্দোলন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ রোববার সকাল ৯টা থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করে। পরে সকাল সাড়ে ১০টায় সফিপুর বাজার থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শতশত শিক্ষার্থী চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যায় এবং মহাসড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় পৌর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ছাত্রদের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিতে সকাল ১০টার পর থেকে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ যোগ দেন। পরে মিছিল নিয়ে তারা কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় অবস্থান নেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে চন্দ্রা ত্রিমোড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এ সময়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও কালিয়াকৈর-নবীনগর সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চন্দ্রা দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করলে তাদের ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় পুলিশবক্স ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এদিকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক থেকে কালিয়াকৈর বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে দিনব্যাপী সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন শ্লোগানে বিক্ষোভ মিছিল করে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা। আন্দোলনকারীরা চন্দ্রা ও কালিয়াকৈরের তিনটি পুলিশ বক্স, চন্দ্রা ত্রিমোড়ে আওয়ামী লীগের অফিস, থানার সামনে রাখা গাড়িসহ বেশকিছু যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে। একপর্যায় পুলিশ ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের হামলায় ওসি গুরুতরসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। এছাড়া, পুলিশের গুলিতে শিশুসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। কালিয়াকৈর পৌর এলাকার সর্বত্র থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
চলমান পরিস্থিতির খবর নিশ্চিত করতে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম নাসিম, কালিয়াকৈর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আজমীর হোসেন, কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও কাউছার আহম্মেদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তারা কেউ ফোন তুলেননি।



