‘একতলা বাড়ি এখনো ডুবে আছে। বাচ্চাদের নিয়ে কোনোরকম জান নিয়ে বেঁচে এসেছি’ ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল আর উজানের পানিতে প্লাবিত বন্যায় নির্ঘুম রাত কাটানোর পর চোখে মুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ফেনী সদরের লালপোল এলাকার বাসিন্দা শিরিন আক্তার।
এদিকে ভয়াবহ বন্যায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে সোনাগাজীবাসী। পানির চাপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকায় গ্রামীণ মানুষের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, বাড়ি-ঘর যেন পানি তোড়ে ভেসে যাওয়ার মতো অবস্থা। অজানা আতঙ্কে ভুগছে বাসিন্দারা। গতকাল বিকেল থেকে মানুষের মাঝে এক বিভিষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
জানা গেছে, উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিয়নগুলোর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ গতকাল রাত থেকে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শুক্রবার (২৩ আগস্ট) আমিরাবাদ, সোনাপুর, বাদামতলি, মতিগঞ্জ, চরদরবেশ, চরখোয়াজ, সুজাপুর, শাহাপুর, সুলাখালী, ছাড়াইতকান্দিসহ পৌর শহরের অনেক জায়গায় পানি ডুকে পড়ে বহু মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
আরো জানা গেছে, কোথাও কোথাও ৭ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত পানি উঠেছে। গ্রামীণ সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেককে গতকাল বিকেল থেকে উপজেলার সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। নবাবপুর, থলিয়া, লালপোল নতুন বজার এলাকার অবস্থা অপরিবর্তীত রয়েছে। সোনাগাজী ফেনী সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ আর মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় দেশ ও দেশের বাইরের স্বজনদের উৎকণ্ঠা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে শুধু নিজ এলাকার পরিস্থিতি জানতে পোস্ট দিচ্ছেন।
ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের উজানের পানি বের করার একমাত্র পথ সোনাগাজী ৪০ ‘রজা’ বিশিষ্ট রেগুলেটর খুলে দেয়া হয়েছে। গত রাত থেকে এই রেগুলেটর ছেড়ে রাখলেও পানির চাপ সামাল দিতে পারছে না। প্রতি ঘণ্টায় এক লাখ কিউসেকের অধিক পানি বড় ফেনী নদীতে বের হওয়ার পরও লোকালয়ে পানির চাপ বাড়ছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, এভাবে পানির চাপ বাড়তে থাকলে আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে সোনাগাজী উপজেলার অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কামরুল হাসান বলেন, ‘সোনাগাজী উপজেলার ৪৩টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে এক লাখের অধিক লোক আশ্রয় নিয়েছে। নিম্নাঞ্চলগুলোতে অনেকে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তাদের উদ্ধারে সেচ্ছাসেবীদের বেগ পেতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গতকাল বিকেলেই রেড এলার্ট জারি করে সকলকে নিরাপদ স্থানে চলে আসতে মাইকিং করা হয়েছিল।’
এদিকে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে যোগাযোগ এখনো বন্ধ রয়েছে। মহাসড়কের ফেনী অংশে পানি কমতে শুরু করেছে। ফেনী শহরের অধিকাংশ সড়ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়ি-ঘর, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পাঠানবাড়ি, পেট্রোবাংলা, পূর্ব উকিলপাড়া, পশ্চিম উকিল পাড়া, রামপুর, মাষ্টারপাড়া, ট্রাঙ্করোড, পাচঁগাছিয়া বাসা-বাড়ি এখনো অন্তত ১০ ফুট পানির নিচে রয়েছে।
ফেনী শহরের পেট্রোবাংলোর সিগমা এপাটমেন্টের বাসিন্দা সুবর্ণা আক্তার জানান, আটতলা ভবনের একতলা ডুবে আছে। আশপাশে সব সড়কগুলো ডুবে আছে। আমরা চতুর্থতলায় রয়েছি। কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। এই ভবনে অনেকগুলো শিশু ও বৃদ্ধ রয়েছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ভারতের উজানের পানির ঢলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর পশুরাম, ফুলগাজী, ছাগনাইয়া, ফেনী সদর উপজেলা তলিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে সোনাগাজীর দিকে পানির চাপ বেড়ে গিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকতে শুরু করেছে।



