স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য শিল্পে। প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাসে প্রলয়ঙ্করি এমন বন্যায় ভেসে গেছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মাছ। কোটিপতি থেকে এখন নিঃস্ব হয়েছেন অনেক চাষি। এমন ক্ষতি কিভাবে বা কতটুকু কাটিয়ে উঠতে পারবে এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চাষিদের মনে।
এ উপজেলায় গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ মৎস্য জোন। প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে গড়ে উঠা এসব মৎস্য প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ৫০ হাজার টন মাছ উৎপাদন হতো। প্রতি সিজনে এসব মৎস্য প্রকল্প থেকে এক হাজার ১২৭ কোটি টাকার মাছ বিক্রি করতেন চাষিরা। মুহুরী চর মৎস্য প্রকল্প থেকে প্রতিদিন ৭০-৮০ টনের বেশি মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে চলে যেত।
জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে সরকার ফেনী নদীর মিরসরাই-সোনাগাজী অংশে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণের পর প্রায় ৫০ হাজার একরের অধিক পরিমাণ চর জেগে উঠে। এই বাঁধ বরাবর পশ্চিম দিকে যেতে বাঁধের দক্ষিণে চোখ যতদূর যায় ততদূর পর্যন্ত শত শত হেক্টর জমিতে শুধু মৎস্য প্রকল্প। চট্টগ্রাম নোয়াখালী, ফেনী জেলার ৭০ ভাগ মাছের চাহিদা পূরণ করার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও যায় মুহুরী প্রকল্পের মাছ। এখানে পাঙ্গাশ, কার্প, তেলাপিয়া, গুলশা, পাবদা, শিং, কৈ ইত্যাদি জাতীয় মাছের চাষ হয়। বিগত ৪০ বছরে মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত মুহুরী প্রকল্প সারা দেশের সবচেয়ে বড় মৎস্য জোন হিসেবে পরিচিত।
মৎস্য চাষিরা জানান, উপজেলার ওচমানপুর ইছাখালী ও ধুম এলাকায় প্রায় ১০ হাজার একর প্রকল্পে মাছ চাষ হচ্ছে। এবারের বন্যায় প্রকল্পের বাঁধ ভেঙে প্রায় সাত হাজার একর প্রকল্পের মাছ ভেসে গেছে। প্রতি একরে ১০ লাখ টাকা করে ধরলে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এ প্রকল্পের মৎস শিল্পে।
ফারহা এগ্রোর স্বত্বাধিকারী কামরুল হোসেন বলেন, আমি প্রায় ২২ বছর ধরে মাছ চাষ করে আসছি। কখনো এত বড় লোকসানের মুখে পড়তে হয়নি আমাকে। প্রায় ১০ কোটি টাকার মাছ বানের পানিতে ভেসে গেছে। আমার ভাই কাউছার হোসেনের প্রায় সাত কোটি, আরেক ভাই জারা এগ্রোর স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাঁচ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। শুধু আমাদের পরিবারের ক্ষতিই হয়েছে ২২ কোটি টাকা। আমাদের মতো আরো শত শত মৎস্যচাষি ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছেন।
একই এলাকার আরেক চাষি জহির উদ্দিন ইরান বলেন, নিজের ব্যক্তিগত পার্টনারে প্রায় ২০০ একর জায়গায় মাছ চাষ ছিল। পানির এত স্রোত ছিল যে পাড় ভেঙে সব ভেসে গেছে। আমার প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
মুহুরী প্রজেক্ট মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত। এবারের বন্যায় ওই এলাকার ফারুক সওদাগরের ১০ কোটি টাকা, সমমনা সমিতির প্রায় এক কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। শেখ ফরিদের ৪০ কোটি টাকার মাছ, শাহ আলমের চার কোটি টাকার, হেলাল উদ্দিনের ১০ কোটি টাকার, কামাল ও সাদেকের ৬ কোটি টাকার, মহি উদ্দিন সওদাগরের এক কোটি টাকার, সততা ফার্মের দুই কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।
মিরসরাই উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা নাসিম আল মাহমুদ বলেন, মিরসরাইয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় প্রাপ্ত তথ্য মতে মৎস্য খাতে আমাদের প্রায় ৩৭৪ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। মৎস্যচাষিদের দাবি ক্ষতির অঙ্কটা ৭০০ কোটি টাকা। আমাদের এখনো পুরো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ অভিযান চলছে।
মিরসরাইয়ে কোটিপতি থেকে নিঃস্ব অনেক মৎস্যচাষি
স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য শিল্পে। প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাসে প্রলয়ঙ্করি এমন বন্যায় ভেসে গেছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার মাছ।...



