জোরপূর্বক পদত্যাগের চাপ, অপমান আর হেনস্তার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন মানিকগঞ্জের ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলার অন্তত ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক। এমনকি অনেক শিক্ষক কর্মস্থল থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তন হওয়ার পর পরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, স্থানীয় এলাকাবাসী ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে সহকারী অনেক শিক্ষক ও কর্মচারীরা বর্তমানে অপসারণ আতঙ্কে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট তিন উপজেলা মাধ্যমিক অফিস সূত্রমতে, ঘিওর উপজেলায় মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৮টি, কলেজ ৫টি ও মাদরাসা রয়েছে ৫টি। শিবালয় উপজেলায় মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৫টি, কলেজ ২টি, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি ও মাদরাসা রয়েছে ৪টি। দৌলতপুর উপজেলায় মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৮টি, কলেজ এবং কারিগরি ও বাণিজ্য ট্রেডভিত্তিক কলেজ মোট ৭টি, মাদরাসা রয়েছে ৭টি। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত একাধিকসূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলের প্রভাব খাটিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। টানা ১৫ বছর দল ক্ষমতায় থাকার কারণে বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ কমিটির সভাপতির পদ দখলে রাখেন সরকারদলীয় ব্যক্তিরা। শিক্ষকরাও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়া এবং দলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে উঠেন। প্রভাব খাটিয়ে করেন ব্যাপক অনিয়ম।
তবে বর্তমানে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি বিলুপ্ত করায় এসব অনিয়ম-দুর্নীতির দায়ভার এসে পড়েছে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের ওপর। অনিয়মে জড়িত শিক্ষকদের অপসারণ দাবি করছেন ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা।

গত বৃহস্পতিবার দৌলতপুর সরকারি পিএস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমানের অপসারণের দাবিতে দুইদিনব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ইউএনও অফিসের সামনে বিক্ষোভ মিছিলসহ স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।
একই দিন বানিয়াজুরী ইউনিয়নের জাবরা শহীদ স্মরণিকা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েদুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ছাত্রীদের সাথে অশ্লীল-অশোভন আচরণের অভিযোন এনে তার অপসারণের দাবিতে বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। গত বুধবার ঘিওরের ফুলহারা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিল্পী আক্তারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবৈধ ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ এনে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

একইভাবে দৌলতপুর উপজেলার বিষ্ণুপুর জিএম উচ্চবিদ্যালয়, ঘিওরের বানিয়াজুরী ইউনিয়ন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দৌলতপুর উপজেলার তালুকনগর ডিগ্রি কলেজ, ঘিওর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, শিবালয় উপজেলার যমুনাবাদ উচ্চবিদ্যালয়, বালিয়াখোড়া উচ্চবিদ্যালয়, ঘিওর উপজেলার পয়লা তেরশ্রী কালী নারায়ণ ইনস্টিটিউশন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, দৌলতপুর উপজেলার কাকনা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধানসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

ঘিওর উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার মেহনাফ ফেরদৌস বলেন, যদি কোনো স্কুলের অনিয়ম থাকে তাহলে নিয়ম অনুযায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে হবে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
ঘিওর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ও মাদরাসাপ্রধানদের নিয়ে আলোচনা করেছি। শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ ও নানাভাবে হেনস্তা করার ঘটনা ঘটছে, যা কাম্য নয়। শিক্ষক অভিযুক্ত হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।