ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল ৩টা ছুঁই ছুঁই। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। একটি ধ্বংসস্তূপ বসতঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন জয়নাল আবেদীন। বৃষ্টির দিকে অপলক দৃষ্টি, চোখে মুখে যেন হতাশার চাপ। ভাবছেন কিছুদিন আগে এমন বৃষ্টি আমার সব শেষ করে দিয়েছে। এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি, ফের যদি বন্যা দেখা দেয়! এমন প্রশ্ন হয়তো ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মনে। শুধু স্বপ্না রানী নয়, এমন শত শত মানুষের এখনো মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি। বন্যায় তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।
গত শুক্রবার সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তাঘাটে বড় বড় গর্ত। পানির স্র্্েরাতে ভেঙে গেছে অনেক সড়ক। বসতঘরের আশপাশে পানি থই থই করছে। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় পানিবন্দী ছিল প্রায় দুই লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হাজার হাজার পরিবার বাড়ি ফিরে এলেও এখনো নিজ বসতঘরে থাকতে পারছে না অনেকে। মাটির ঘরগুলো একেবারে শেষ হয়ে গেছে। মাটির ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে রয়েছে আলমিরা, ফ্রিজ, জামা-কাপড়, লেফ তোষক ও কাঁথা কম্বলসহ মূল্যবান আসবাবপত্র কাদামাটিতে পড়ে রয়েছে। এক একটি ঘর যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
উপজেলার কাটাছরা ইউনিয়নের শিকার জনাদ্দনপুর গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, বন্যায় আমি সর্বস্বান্ত, ছোট্ট বসতঘরটি পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ১৫ দিন আগে বাড়ি এলেও একদিন ঘরে থাকতে পারিনি। কী খাবো? কিভাবে ঘর মেরামত করব বুঝতেছি না।
করেরহাট ইউনিয়নের ভালুকিয়া এলাকার স্বপ্না রানী বলেন, চোখে ঘোর অন্ধকার দেখছি। টানা ১০ দিন আমার পুরো ঘর পানির নিচে থেকে মাটির সাথে মিশে গেছে। ঘরে থাকা ধান থেকে চারা হয়ে গেছে। টাকার অভাবে ঘরের সংস্কার করা যাচ্ছে না। অন্যের বাড়িতে কয়দিন থাকা যায়?
জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের আপন চন্দ্রনাথ বলেন, একটা সময় প্রাণ নিয়ে বেঁেচ থাকার শঙ্কায় ছিলাম। আমার বাপ-চাচারা চার ভাই একসাথে থাকে। প্রায় ১০ দিন ধরে পুরো বাড়ি পানির নিচে ডুবে ছিল। সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে নতুন করে ঘরের কাজ করা সম্ভব না।
জয়নাল, আপন, রীনার মতো অন্যের ঘরে বসবাস করতে হচ্ছে শত শত পরিবারকে। তারা বন্যায়, ঘরবাড়ি, ঘোলা ভরা ধান, পুকুরের মাছ, জমির ফসলসহ সবকিছু হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
জানা গেছে, গত ২১ আগস্ট থেকে ভারী বৃষ্টি ও ফেনী নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় মিরসরাই উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হওয়ায় টানা সাতদিন পানিব›ীদ ছিলেন দুই লাখ মানুষ। কৃষি, মৎস্য, পোলট্রি, ডেইরি, সড়কসহ সব সেক্টরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রশাসক মাহফুজা জেরিন জানান, আগস্ট মাসের সৃষ্ট বন্যায় এ উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত মানুষকে উদ্ধার তৎপরতা, খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোসহ সাধ্যমতো কাজ করেছি। এখানকার প্রায় সব সেক্টরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক হাজার ৬০০ বসতঘরের তালিকা সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে।