স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কৃষি খাতে ১২৬ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চলতি মৌসুমে রোপা আউশ, রোপা আমন, আমন বীজতলা, শরৎকালীন সবজি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে সব নষ্ট হয়ে গেছে। সবকিছু হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ৩০০ কৃষক। মিরসরাই উপজেলার কৃষি অফিস সূত্র থেকে ১৬ ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার ক্ষয়ক্ষতির এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
গত ২১ আগস্ট থেকে টানা সাত দিনের বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়ে ১১টি ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষ। হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। পানির স্রোতে ভেসে যায় বাড়িঘর। পানিতে নিমজ্জিত হয়ে সবকিছু শেষ হয়ে যায় কৃষকের। এখন নতুন করে চাষাবাদ করতে বীজ, রোপাচারা ও পুঁজি সঙ্কটে পড়েছেন তারা।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় চলতি মৌসুমে পাঁচ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয়েছে। বন্যায় ক্ষতি হয়েছে চার হাজার ৪০০ হেক্টর জমির রোপা আউশ। এক হাজার ২২০ হেক্টর আমনের বীজতলার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯০০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা। চার হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে আমনের রোপাচারা লাগানো হয়েছিল। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চার হাজার ৫০০ হেক্টর জমির রোপা আমন। ১২৫ হেক্টর শরৎকালীন সবজির মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ১০০ হেক্টর জমির সবজি।
উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের কৃষক আফতাব উদ্দিন বলেন, এবারের বন্যায় আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। পাঁচ একর জমিতে চাষ করা রোপা আমন পানিতে তলিয়ে সম্পূর্ণ পচে গেছে। ৫০০ বস্তায় আদা চাষ, এক একর জমির সবজি সব নষ্ট হয়ে গেছে। গরুর খামার, মুরগির খামার, দুধের মেশিন, মোটর, ফ্রিজ সব শেষ। বন্যার পর খামারের দু’টি গরু মারা গেছে। গরুর জন্য চাষ করা আট একর জমির ঘাসও পানিতে পচে গেছে। সব মিলে বন্যায় আমার প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলার মসজিদিয়া এলাকার গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষি ইকবাল হোসেন বলেন, পাঁচ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলাম। বিক্রিও শুরু হয়েছিল, কিন্তু বন্যায় সব শেষ। এবার চার লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করেছিলাম, মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রির পর বন্যায় সব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বর্ষাকালীন টমেটো ও কাঁচামরিচের জমিও শেষ।

ওচমানপুর এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা এএসএম ইফতেখারুল হক বলেন, আমি দেড় বছর আগে থেকে কৃষি ও অ্যাগ্রো সেক্টরে মনোনিবেশ করি। এবারের বন্যায় আমার সব শেষ। পানিতে ভেসে গেছে ২২০টি টাইগার মুরগি ও ১৫০টি হাঁস। মারা গেছে দু’টি গরুর বাছুর ও তিনটি ছাগল। সবমিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলার আজম নগর এলাকার কৃষক গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারো প্রায় পাঁচ একর জমিতে আমনের রোপা লাগিয়েছিলাম। বন্যার পানিতে সব ডুবে গেছে। এখন কী করব বুঝতেছি না। তিনি আরো বলেন, আমাদের বাপ-দাদাও কোনদিন এত পানি দেখেনি। প্রায় গলা সমান পানি উঠেছে ঘরের মধ্যে।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় মিরসরাই উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় এ উপজেলায় ১২৬ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করেছি। সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে অনেক কৃষক।