কখনো কখনো মানুষ শুধু স্বপ্ন দেখে না, স্বপ্নকে ছুঁয়ে ফেলে। আর সেই স্পর্শ করা স্বপ্নের পেছনে থাকে না আলোঝলমলে শহর, থাকে না অভিজাত কোচিং বা ডিজিটাল সুবিধা। থাকে কেবল মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা এক কোমল হৃদয়ের সাহস, মায়ের চোখের জল, বাবার শেষ রোজগারের টাকায় কেনা কলমের নিব।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের বিষ্ণুদি গ্রামের এক নিভৃত কোণে বেড়ে ওঠা এমনই এক কিশোর—সুব্রত কুমার কুন্ডু। ক্ষুদ্র মুদি দোকানি সুধির কুন্ডু আর গৃহিণী মায়ের সংসারে বেড়ে ওঠা সুব্রত কখনো জানেনি স্মার্টফোন কী, ইন্টারনেট কীভাবে চলে, কিংবা কোচিং সেন্টার কেমন জিনিস। তবু তার হৃদয়ে ছিল অদম্য এক আগ্রহ—ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সুব্রত ফুলবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে অংশ নেন এসএসসি পরীক্ষায়। পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তেই হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। দুর্বল শরীর, শীর্ণ গলা—তবু মা'র আঁচল ধরে, বাবার ভরসার বাক্যে প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।
মাঝে মাঝে কেঁদে উঠে বলতেন—‘আমি পারবো না মা, আমি ফেল করবো!’ কিন্তু মা শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, ‘ভরসা রাখ, তুই পারবি!’
আজ সেই কথার সত্যতা প্রমাণ করে সুব্রত এসএসসি পরীক্ষায় অর্জন করেছেন জিপিএ-৫। স্কুলটির যেখানে পাশের হার মাত্র ৩৩.৩৩ শতাংশ, সেখানে তিনি একাই যেন হয়ে উঠেছেন আলো ছড়ানো এক প্রদীপ।
তবে এই প্রদীপের আলো ছুঁতে পারছে না ভবিষ্যতের অন্ধকার।
কলেজে ভর্তি হওয়া, বই কেনা, পাঠ চালিয়ে যাওয়া—সবই এখন একেকটি স্বপ্নের মতো দূরে। দরিদ্রতার বেড়াজালে বন্দি সুব্রতর পরিবার জানে না, আগামী দিনগুলো কিভাবে চলবে।
তাদের এখন একটিই প্রার্থনা—
‘আমার ছেলেটা মেধাবী, পরিশ্রমী—কেউ যদি তার পাশে দাঁড়াতো! সমাজের কেউ যদি একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিত!’
সুব্রতের এই সংগ্রামের কথা পৌঁছে গেছে প্রশাসনের কানে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আনিচুর রহমান বালি জানান, ‘সুব্রতের কৃতিত্বকে আমরা সম্মান জানাই। তার উচ্চশিক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে সে উপজেলা প্রশাসনের পাশে পাবে।’
এমন মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানো মানে কেবল একজন মানুষকে এগিয়ে দেয়া নয়—সমাজকে আলোকিত করার দায়িত্বও বয়ে নেয়া। সুব্রতের মতো প্রতিভারা যেন অভাবে থেমে না যায়—এই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।





