বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসাদুজ্জামান(৭৫) মারা গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

শুক্রবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজশাহী নগরীর উপশহরের ভাড়া বাসায় তিনি মারা যান।

আসাদুজ্জামানের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করা বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, আগে থেকেই আসাদুজ্জামান কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। বেশ কয়েক দিন ধরেই জ্বর ছিল তার। বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। শুক্রবার সকালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে হাসপাতালে নেয়ার আগেই মারা যান তিনি।

এদিকে ড. এম আসাদুজ্জামানের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে বাদ জুম’আ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে।

ড. আসাদুজ্জামান এক স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার দুই সন্তানই আমেরিকায় থাকেন। ছেলে জাতিসংঘের বড় পদে চাকরি করেন। সন্তানেরা দেশে ফেরার পর তার দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান প্রকৌশলী তরিকুল।

আসাদুজ্জামান রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভার কেল্লাবারুইপাড়া মহল্লার বাসিন্দা। আট ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তার বড় ভাই ড. এম এনামুল হক ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। আরেক ভাই প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হক ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের এমপি ছিলেন। এছাড়া তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীও ছিলেন। অপর ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সামরিক সচিব ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে কিছুদিন পর ড. এম আসাদুজ্জামানকে বিএমডিএর চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হয়। ১৯৯২ সালে বিএমডিএ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন ড. আসাদুজ্জামান।

বিএমডিএর এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ড. আসাদুজ্জামান একজন বহুমাত্রিক শিক্ষাজীবনের অধিকারী ছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইরিগেশন ও ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। কৃষির ওপর গভীর গবেষণার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে কৃষি বিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরে ২০০৭ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে অ-লাভ জনক প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নির্বাহী শিক্ষা কোর্স সম্পন্ন করেন।

ড. আসাদুজ্জামান কর্মজীবন শুরু করেন একজন ইরিগেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। তিনি ১৯৯২, ১৯৯৬ এবং ২০০২, ২০০৬ এই দুই মেয়াদে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তারপরও থেমে থাকেননি তিনি। কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংক, সিডা, ডিএফআইডি ও এডিবি-এর পরামর্শক হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করেন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি অবদান রাখেন। ড. আসাদুজ্জামান ছিলেন একাধারে গবেষক, উদ্ভাবক ও প্রয়োগবাদী। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল ভূগর্ভস্থ পানি, টিউবওয়েল ডিজাইন, সেচ ব্যবস্থাপনা ও খরচ পুনরুদ্ধার।

তার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ ছিল প্রিপেইড মিটার ও স্মার্ট কার্ডভিত্তিক সেচ খরচ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা চালু করা, যা বাংলাদেশের সেচ খাতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এতে কৃষক স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে সেচ সুবিধা পেতে শুরু করে। তার নেতৃত্বে বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহ কৃষি বিপ্লবের সূচনা করে। মরুপ্রায় বরেন্দ্র অঞ্চল আজ শস্যসমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করেছে, যা বরেন্দ্র মডেল নামে খ্যাত। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। তার অবদান দেশের জন্য এক স্থায়ী সম্পদ হয়ে থাকবে বলেও বিএমডিএর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।