দেশে এই মুহূর্তে এএফসির ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচ আছেন ৬৩ জন। এর মধ্যে সক্রিয় আছেন ৪০ জনের মতো। একজন মারা গেছেন। এখন বাফুফে ভবনে চলছে বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটুর অধীনে ‘এ’ লাইসেন্স কোর্স। এতে অংশ নিচ্ছেন এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ানসহ ২৪ জন। এদের মধ্যে দুই বাংলাদেশী নারী। উভয়ই চাকমা জনগোষ্ঠীর। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই দুই ফুটবলার হলেন জয়া চাকমা ও লিনা চাকমা। দেশের প্রথম নারী ফিফা রেফারি হিসেবে আগেই ব্যাপক পরিচিতি পান জয়া। এখন তিনি সাফ ফুটবলের নিয়মিত বাঁশিওয়ালা। তবে সেভাবে পরিচিত নন লিনা। দুইজনেরই বাড়ি পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে। এর আগে বাংলাদেশের আরো তিনজন নারী কোচ এএফসির ‘এ’ লাইসেন্স কোর্স করেছিলেন। এরা হলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, মিরোনা ও অনন্য। তবে তারা পাস করতে পারেননি। এখন পাস করার পালা দুই পাহাড়ি নারীর।
২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ দলে খেলেছেন জয়া। খেলোয়াড়ি জীবনে পেয়েছেন দু’টি সাফ। এরপর বিজেএমসিতে খেলে ২০১৬ সালে কোচ হিসেবে চাকরি নেন বিকেএসপিতে। ২০২০ সালে জয়া প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে ফিফা রেফারি হন। যদিও এবার ফিফা তালিকায় থাকা হয়নি। রেফারি হিসেবে দু’টি মহিলা সিনিয়র সাফে খেলা চালিয়েছেন। আর বয়সভিত্তিক সাফে জয়াকে ছাড়াতো রেফারিং কল্পনাও করতে পারে না সাফ কর্তৃপক্ষ। সেই ২০১৩ সাল থেকে রেফারিং করছেন জয়া।
জয়া একই সাথে সফল রেফারি এবং সফল কোচও। তার অধীনে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে টানা তিনবার ভারতের সুব্রতকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বিকেএসপি অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল দল। আর গত বছর বিকেএসপি অনূর্ধ্ব-১৭ দল রানার্সআপ হয় এই আসরে। এ ছাড়া গত বছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিক স্পেশাল অলিম্পিকের এশিয়ান রিজিওনে চ্যাম্পিয়ন হয় জয়ার দল। একই সাথে রেফারি ও কোচ। ফুটবলের এই দুই ক্ষেত্রকে আলাদা করতে চান না। জানান, ‘আমি দু’টিকে আলাদা করতে চাই না। মোট কথা হলো ফুটবল। তবে রেফারিং করতে গিয়ে যা দেখেছি সেটাই কিন্তু আমার দারুণ কাজে লাগছে কোচিংয়ে।’ জয়া অবশ্য বাংলাদেশ দলের কোচ হওয়ার স্বপ্নটা লুকাতে পারলেন না। ‘যদি প্রস্তাব আসে তাহলে অবশ্যই লাল-সবুজদের কোচিং করাব।’ জয়ার বোন মায়া চাকমাও খেলোয়াড়। তিনি কারাতেকা।
ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার সাথে সম্পৃক্ত জয়া। জয়া নিজেও কারাতের খেলোয়াড় ছিলেন। এরপর অ্যাথলেটিক্স, হ্যান্ডবল হয়ে ফুটবলার হলেন। খেলতেন মিডফিল্ডে। তার খেলোয়াড়ি জীবনে স্মরণীয় ঘটনা হলো, ইন্দো-বাংলা ফুটবল খেলতে সড়ক পথে ভারতে যাওয়ার পর। জানান, সীমান্ত পেরিয়ে যখন ভারতে প্রবেশ করলাম তখন আমি মনে করেছিলাম বিদেশ মানে কী জানি কত কিছু। কিন্তু আমার কাছে ভারতকে মনে হয়েছিল বাংলাদেশের মতোই।
২০০৬ সালে বাংলাদেশ দলে খেলা লিনা চাকমার। পরীক্ষার জন্য ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ছিলেন বাইরে। এরপর ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গায়ে তুলেছেন লাল-সবুজ জার্সি। লিনা খেলেছেন সাফ ফুটবল ও অলিম্পিক বাছাই ফুটবলে। লিনাকে ফুটবলে আসতে হয়েছিল পরিবারের বাধা পেরিয়ে। ২০০৪-৫ সালে কোচ আবুল বাশার চৌধুরী তাকে বাড়ি থেকে পালাতে উদ্বুদ্ধ করেন ঢাকায় খেলতে আসার জন্য। পরে তার পবিরার খোঁজাখুঁজি করলে পুলিশ জানায় লিনা যে কোচের সাথে গেছে। পরিবার থেকে আটকে পর্যন্ত রেখেছিল খেলার জন্য।
জয়ার মতো লিনাও রেফারি। তবে জয়া এখনো রেফারিং করলেন লিনার বাঁশি-পাতাকা নিয়ে ফুটবল মাঠে নামা হয়নি। জানান, জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর ২০১৫ সালে রেফারি হই। চালাই পাইওনিয়ার লিগ, বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল ও বঙ্গমাতা ফুটবল।’ ছিলেন তৃতীয় শ্রেণীর রেফারি। এরপর ২০১৭ সালে ফুটবল কোচিংয়ে। কোচিংয়ে আসার পর লিনার রেফারিং পর্বে ইতি। কোচিংয়ে তার সেরা সাফল্য বিকেএসপির একটি প্রজেক্ট দলকে নিয়ে বিকেএসপিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। তা ২০২১ সালে। এখন রাঙ্গামাটিতে জেলা ফুটবল অ্যাকাডেমিতে কাজ করছেন লিনা। তারও স্বপ্ন জাতীয় দলে কোচিং করা। দেশের জন্য দেশের মেয়েদের জন্য কিছু করার জন্যই লিগে মোহামেডান ও আবাহনীতে খেলা এই ফুটবলার এখন করছেন ‘এ’ লাইসেন্স কোর্স।



