বিগ ম্যাচ বোধহয় একেই বলে। উত্তেজনার পারদ উঠেছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, গোল-পাল্টা গোল কোন কিছুরই কমতি ছিল না স্পেন-পর্তুগাল ম্যাচে। দারুণ লড়াইয়ের এই ম্যাচে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায়নি, তাই জয় পায়নি কোন দল। ৩-৩ গোলে ড্র হয়েছে ম্যাচটি।

একদিকে দুর্দান্ত স্পেন, দুর্দান্ত তাদের মাঝমাঠ, দুর্দান্ত আক্রমণভাগ। একের পর এক সাজানো আক্রমণ। আর অন্য দিকে কেবল একটি নাম- ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। যদি বলা হয় স্পেনের এগারো জনের বিরুদ্ধে একাই খেলেছেন রোনালদো, খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না হয়তো।

রোনালদো কতটা মরিয়া ছিলেন এই ম্যাচে সেটি যারা খেলা না দেখেছেন বোঝানো কষ্ট। শেষ ফ্রি-কিকটি নেয়ার সময় তার মুখমণ্ডলে দেখে মনে হয়েছে যেন ফ্রি-কিক নয়, পেনাল্টি নিতে যাচ্ছেন তিনি। হয়েছেও তাই। ছয় জনের মানব প্রাচীরও আটকাতে পারেনি তার কিক।

এবারের বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক এলো সিআর সেভেনের পা থেকে। একাই যেন স্পেনকে রুখে দেয়ার কাজটি করেছেন এই সুপারস্টার। প্রথমার্ধে জোড়া গোলে দুই দফা লিড নেয়া আর একেবারে শেষ মূহুর্তে পরাজয় এড়ানো গোলে হ্যাটট্রিক পূরণ করেন তিনি।

খেলার চতুর্থ মিনিটেই লিড নেয় পর্তুগাল। আড়াই মিনিটের সময় বল নিয়ে স্পেনের ডিবক্সে ঢুকে পড়েন রোনালদো। পিকে’কে কাটিয়ে যখন নাচোকে ডজ দিলেন, মারাত্মকভাবে ফাউল করেন নাচো। পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। রোনালদোর মাপা শট কোন দিকে যাবে বুঝতেই পারেননি স্পেনের গোলরক্ষক ডি গিয়া। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় পর্তুগাল।

এর পরই গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে স্পেন। দুই পাশ দিয়ে চলে একের পর এক আক্রমণ। গোল সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পর্তুগালের ডিফেন্স। অবশেষে সার্জিও রামোসরা সফলতা পায় ২৪ মিনিটে। বক্সের ভেতর থেকে ডিয়াগো কস্তার শট জালে জড়ায়।

গোল শোধ করেও খেলার সেই একই ধারা অব্যাহত রাখে স্পেন। ২৬ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে ইসকোর জোড়ালো শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ৩৫ মিনিটে ইনিয়েস্তার মাটি কামড়ানো শট বারের পাশ ঘেঁষে চলে যায়। তবে এর মধ্যেও বেশ কয়েকবার কাউন্টার এ্যাটাক থেকে সুযোগ তৈরি করে পর্তুগাল।

২২ মিনিটে বাম প্রান্তে বল নিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন রোনালদো। কিন্তু পোস্টে শট না নিয়ে তিনি বক্সের মাঝখানে গুয়েদেসের কাছে কেন পাস দিয়েছিলেন সেটি আশ্চর্য হওয়ার মত বিষয়। তবু গুয়েদেস প্রথম চান্সে শট নিতে পারলে আরেকটি নিশ্চিত গোল ছিলো।

৪৪ মিনিটে আরেক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সেই গুয়েদেসের পাসেই গোল করেন রোনালদো। মাঝমাঠ থেকে বক্সের মাথায় বল পেয়ে গুয়েদেস বাম পাশে পাস দেন রোনালদোকে। কেউ বাঁধা দেয়ার আগে বাম পায়ের বুলেট গতির শট! গোল রক্ষক ডি গিয়ার হাত ফসকে বল জালে জড়ায়। ২-১ গোলে এগিয়ে যায় পর্তুগিজরা।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও গোল শোধে আবার একের পর এক আক্রমণ চালায় স্পেন। মাঝমাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে গোছালো আক্রমণ করে প্রতিবার। ৫৫ মিনিটে আসে সফলতা। এবারো নায়ক সেই ডিয়েগো কস্তা। গোলের সামনে বল পেয়ে আলতো করে ঠেলে দেন জালে। তিন মিনিট পর আবার আক্রমণ করে স্পেন। বাম প্রান্তের আক্রমণ ক্লিয়ার করেন পর্তুগিজ ডিফেন্ডাররা; কিন্তু বক্সের মাথায় বল গিয়ে পরে নাচোর সামনে। এক মূহুর্ত দেরি না করে বুলেট গতির শট নেন নাচো। গোল পোস্টের এ মাথা থেকে ও মাথা, অর্থাৎ দুই সাইড পোস্টে লেগে বল জালে জড়ায়। এই প্রথম এগিয়ে যায় স্পেন(৩-১)।

এবার গোল শোধে পাগলপারা হয়ে ওঠে পর্তুগাল। এতক্ষণে মনে হয় তাদের মাঝমাঠ বলতে কিছু একটা আছে। বেশ কয়েকটি আক্রমণ চালায় রোনালদোর দল। ৮৬ মিনিটে বক্সের সামান্য বাইরে রোনালদোকে আবারো ফাউল করে স্পেন। এবার ভিলেন পিকে। ফ্রি-কিক পায় পর্তুগাল। ছয়জনের মানব প্রাচীর টপকে রোনালদোর বাকানো শট ঠিকানা খুঁজে পায় জালে। হ্যাটট্রিক পূরণ করেন রোনালদো, দল ফেরে সমতায়(৩-৩)।
এরপরের সময়টুকু দুই দলই দখলে রেখেছে বল। তবে কেউ আর কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি।

আরো পড়ুন :

ইরানকে জয় উপহার দিল মরক্কো!
এ যেন আগের ম্যাচের ধারবাহিকতা। পুরো ম্যাচ সমানে সমানে লড়াই করল দুই দল। শেষ মূহুর্তের ফ্রি কিক থেকে হেডে গোল! শেষ পর্যন্ত দারুণ লড়াই করেও হেরে গেল একদল। হাসতে হাসতে মাঠ ছাড়লো অন্য দল।

প্রায় একই রকম ঘটনা শুক্রবারের দুই ম্যাচে। পার্থক্য বলতে শেষ ম্যাচের গোলটি ছিলো আত্মঘাতি। নিজেদের জালে বল জড়িয়ে ইরানকে জয় উপহার দিলো মরক্কো। বি গ্রুপের প্রথম ম্যাচে তাই ১-০ গোলে জয় পেল ইরান।

উরুগুয়ে শেষ মূহুর্তে মিসরের জালে বল জড়িয়ে জয় পেয়েছে, আর মরক্কো নিজেদের জালে বল জড়িয়ে জয় তুলে দিয়েছে ইরানকে। দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বীতার ম্যাচের ইনজুরি টাইমে (৯৫ মিনিট) বা প্রান্ত দিয়ে উড়ে আসা ইরানের ফ্রি কিক ক্লিয়ার করতে হেড করেছিলেন মরক্কোর আজিজ বোহাদ্দুজ। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, বল বাইরে যাওয়া পরিবর্তে জড়িয়ে যায় নিজেদের জালেই।

অথচ পুরো ম্যাচ দাপটের সাথে খেলেছে মরক্কো। দ্বিতীয়ার্ধে তাদের আক্রমণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিলো ইরানিরা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আফ্রিকার দেশটির, নিজেদের জালেই জড়িয়ে গেল তাদের হেড। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয় পেল ইরান।

সালাহ’র অভাব টের পেল মিসর

হেডে গোল করছেন উরুগুয়ের ডিফেন্ডার হোসে মারিয়া গিমেনেজ - ছবি : সংগ্রহ
পুরো ম্যাচ দুর্দান্ত খেলেও শেষ মূহুর্তের গোলে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের কাছে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হেরেছে মিসর। ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে ফ্রিকিক থেকে উড়ে আসা বলে হেডে গোল করেন উরুগুয়ের ডিফেন্ডার হোসে মারিয়া গিমেনেজ।

২৮ বছর পর বিশ্বকাপ খেলতে এসেই মিসরকে এই ম্যাচে মাঠে নামতে হয়েছে নিজেদের সেরা তারকা মোহাম্মদ সালাহকে ছাড়াই। ইনজুরি আক্রান্ত সালাহ এই ম্যাচে মাঠে নামবেন বলেই জানানো হয়েছিলো; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মাঠে নামানটি কোচ হেক্টর কুপার।

গোল করার পর উরুগুয়ে যখন উল্লাসে ব্যস্ত, টিভি ক্যামেরা তখন তাক করা হয় মিসরের সাইড বেঞ্চে সালাহর উপর। মাথা নিচু করে আফসোস করা ছাড়া যেন আর কিছুই করার ছিলো না সালাহর।

একাতেরনিবার্গে এই ম্যাচে সমানতালেই সুয়াজের-কাভানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে মিসর। বল দখলের লড়াইয়ে অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিলো তারা। কিন্তু একজন সালাহর অভাব তো আর পূরণ হওয়ার নয়, তাই মাঝমাঠে বল নিজেদের দখলে রেখেও খুব বেশি আক্রমণ করতে পারেনি প্রতিপক্ষের সীমানায়। ফরোয়ার্ডদের কেউ ভয়ঙ্কর উঠতে পারেননি, যার ফলে গোলও আদায় করতে পারেনি দলটি। নিজদের সীমানা কিংবা মাঝমাঠ থেকে সাজানো আক্রমণ করেও বারবারই প্রতিপক্ষের ডিবক্সের কাছে গিয়ে ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে মিসর।

তবে উরুগুয়ের দুই ফরোয়ার্ড এডিসন কাভানি ও লুইস সুয়ারেজ বেশ কিছু আক্রমণ করেছেন মিসরের গোলপোস্টে। আর খেলার শেষ ১৫ মিনিটে মোটেই খুঁজে পাওয়া যায়নি শুরুর মিসরকে। এই সময়টা উরুগুয়ে তাদের ব্যস্ত রেখেছে গোল ঠেকাতে। কাভানি ও সুয়ারেজ বেশ কয়েকবার গোলের খুব কাছে গিয়েও শেষটা সুন্দর করতে পারেননি।

৭৩ মিনিটে কাভানির সাইড ভলি থেকে বক্সের মধ্যে বল পেয়ে প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন লুইস সুয়ারেজ; কিন্তু তার পা থেকে বল কেড়ে নেন মিসরীয় গোলরক্ষক এসাম আল হাদারি। ৮৩ মিনিটে আবার সুয়ারেজের দেয়া বল থেকে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে বুলেট গতি শট নেন কাভানি, এবারও দুর্দান্ত প্রচেষ্টায় ঠেকিয়ে দেন হাদারি।

৮৩ মিনিটে কাভানির ফ্রি-কিক ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। তবে ৮৯ মিনিটে উপর্যপুরী এই আক্রমণের ফল হাতে পায় তারা। ডান প্রান্তে ফ্রি-কিক পায় উরুগুয়ে। বক্সের মধ্যে জটলায় উড়ে আসা বলে হেড করেন ডিফেন্ডার হোসে মারিয়া গিমেনেজ। পরের কয়েক মিনিটে প্রাণপণ চেষ্টা করেও গোল শোধ করতে পারেনি মিসর।