বিশ্বকাপ বলে কথা। গেটেস্ট শো অন আর্থের চাক্ষুস স্বাক্ষী হতে কে না চান। যেভাবে পারেন সামর্থ্য থাকলেই চলে আসেন বিশ্বকাপ ফুটবলের ভেন্যুতে। চলে যান গ্যালারিতে। তাই বলে অক্ষম শরীর নিয়ে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে ? হ্যাঁ, এই কঠিন কাজটিই করেছেন মেক্সিকোর মার্টিনা ও আর্জেন্টিনার ক্রিশ্চিয়ানো। তারা হুইল চেয়াবে চড়ে আল্টান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চলে এসেছেন রাশিয়ায়। দেখছেন বিশ্বকাপের খেলা।
মেক্সিকান মার্টিনার অনেক বয়স হয়ে গেছে। এখন তার বয়স চলছে ৮২। এই বয়সে তার বাড়িতে বিশ্রাম নেয়ার কথা। চিন্তা করার কথা পরকালের জন্য; কিন্তু ফুটবলের প্রতি তার অদম্য ভালোবসা, অকৃত্রিম দরদই নিয়ে এসেছে হাজার মাইল দূরে। ছেলে ড্যানিয়েলকে সাথে নিয়ে চলে এসেছেন রাশিয়ায়।
পর্তুগাল-মরক্কো ম্যাচের আগে তাকে পাওয়া গেল মস্কোর লুজনিয়াকি স্টেডিয়ামে। বেশ কয় বছর আগে প্যারালাইসিস হয়ে গেছেন মার্টিনার; কিন্তু বন্ধ করেননি বিশ্বকাপ খেলা দেখা। দোভাষীর সহায়তায় আলাপ হয় তার সাথে। জানান, এই শারীরিক অবস্থা নিয়েই তিনি ব্রাজিল বিশ্বকাপের খেলা দেখেছেন। তবে সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি অনেক ম্যাচ দেখেছেন। নিজ দেশের মাঠে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ এর বিশ্বকাপ খেলায় মাঠে ছিলেন। এখন ছেলেকে সাথে নিয়ে চলেন। ছেলে তার হুইল চেয়ার ঠেলার দায়িত্বে থাকে।
বুধবার নিঝনি নবগোরদ মেট্রো স্টেশনে সাক্ষাৎ হয় আর্জেন্টিনার ক্রিশ্চিয়ানোর সাথে। বাবা কার্লোসকে সাথে নিয়ে তিনিও এসেছেন বিশ্বকাপে নিজ দেশের খেলা দেখতে। বাবাই যে তার হুইল চেয়ারের চালক। কার্লোসের ছয় সন্তান। এর মধ্যে ক্রিশ্চিয়ানোই জন্মের পর থেকে শাররীক প্রতিবন্ধী; কিন্তু জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই ফুটবল পাগল ছেলেটি। বিদেশে গিয়ে খেলা দেখাও তার থামানো যায় না অদম্য ইচ্ছের কারণে। ঠিক মতো কথাই বলতে পারেন না ২৮ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন। এরপরও জানান, এটা আমার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে গিয়ে ছয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখেছি। এবার আর্জেন্টিনার সকল ম্যাচ দেখবো।
শুধু বিশ্বকাপই নয়। দুটি অলিম্পিক গেমসও ক্রিশ্চিয়ান দেখেছেন হুইল চেয়ার চেপে। ২০১২ এর লন্ডন ও ২০১৬ এর রিও অলিম্পিক গেমস তিনি স্টেডিয়ামের দর্শক ছিলেন। সাথে বাবাও।
আরো পড়ুন: জেগে উঠবে কি রাশিয়ার ফুটবল?
‘কাল আমাদের ওয়ার্কি ডে। তা না হলে দেখতে কিভাবে সারা রাত আনন্দ করতাম সেন্ট পিটার্সবার্গে।’ মিসরের সাথে জয়ের পর এভাবেই আনন্দ মাখা কষ্ট নিযে কথা গুলো বললেন তরুন রাশিয়ান সার্গেই। তারা দারুন খুশী এবারের বিশ্বাকাপে রাশিয়ার জয়ে। তার মতো উৎফুল্ল বর্ষীয়ান ভেসেলি, আন্দ্রেরা। নিজ মাঠে বিশ্বকাপ। টানা দুই জয় স্বাগতিকদের। প্রথম দল হিসেবে তারা চলে গেছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। স্থানীয়দের মধ্যেও এখন দারুন আগ্রহ ফুটবল নিয়ে। কিন্তু এই সাফল্য কি জাগিয়ে তুলবে দেশের ফুটবলকে। এ বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া গেলনা রাশিয়ানদের।
সার্গেই জানান, বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়ায় কিছু নতুন স্টেডিয়াম হয়েছে। কিছু নতুন মেট্রো রেল স্টেশন হয়েছে। তার মানে এই নয় যে বিশ্বকাপ পাল্টে দেবে দেশের ফুটবলকে। তিনি উদহারন টানেন, সচিতে অনুষ্ঠিত শীত কালীন আলিম্পিকের। বললেন, সচির সেই অলিম্পিক ভেন্যূ এখন পরিত্যাক্ত অবস্থ্য়া পড়ে আছে। এবারের বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে সারানস্ক শহেরে নতনু স্টেডিয়াম বানানো হয়েছে । কিন্তু ছোট্ট এই শহরের নিজম্ব কোনো ফুটবল টিম নেই।
তার আশাবাদ, হয়তো এই বিশ্বকাপ মানসিকতার পরিবর্তন আনবে রাশিয়ানদের মধ্যে। একই সাথে বিশ্বের অন্য দেশের মানুষের ও ধারনা পাল্টে যাবে রাশিয়া সম্পর্কে। আগে তো তাদের বাজে ধারনা ছিল আমাদের সম্পর্কে। এখন তারা বুঝছে আমরা আসলে কতো ভালো।
বর্ষীয়ান ইঞ্জিনিয়ার ভেসেলির তার ছেলেকে নিয়ে এসেছেন খেলা দেখতে। তার বক্তব্য, দল জিতেছে এতে আমরা খুশী । কিন্তু এতে যে পাল্টে যাবে দেশের ফুটবল, ব্যাপক উন্নতি হবে এই খেলাতে সে আশা আমি করিনা। মানুষ খেলা দেখছে। দল জয় পাচ্ছে, তারা খুশী হচ্ছে কিছুক্ষণ আনন্দ করছে এটাই যথেষ্ট। এরচেয়ে বেশী কিছু হবে না।
তবে দেশটির ফুটবলে উন্নতি হোক বা না হোক দুই জয় পাল্টে দিয়েছে পুরো চিত্র। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে যে ম্যাড়ম্যাড়া ভাব ছিল মস্কোতে এখন তা নেই। রুশরা এখন তাদের জাতীয় দলের জার্সী পড়ে ঘুরছে গর্বের সাথে। আলোচনা করছে দেশের ফুৃটবল নিয়ে। মিডিয়া কর্মীদের দেখলে সম্মান করছে। দুই জয় গত দশ দিনে এই পরিবর্তনটা এনেছে স্থানীয়দের মাঝে।






