শুরুটা এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে দিয়ে। শেষটা লাউতারো মার্টিনেজে। পরশু রাতে কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলের জয় বলতে গেলে এই দুই মার্টিনেজের কল্যাণে। প্রথমে ডাচদের দুই শট ঠেকিয়ে আলবিসেলেস্তেদের জয়ের ভিত্তি গড়ে দেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। এরপর জয়োল্লাস লাউতারো মার্টিনেজের পঞ্চম শটে। যা ২০১৪ সালের পর ফের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিয়ে গেল ম্যারাডোনার দেশকে। আর ডাচদের বিপক্ষে ৮ বছর আগের ম্যাচের মতো এই খেলাতেও ল্যাতিন দেশটির জয় পেনাল্টিজে। পুরো ম্যাচে দাপটের সাথে খেলেছেন মেসি। নিজে গোল করেছেন। গোলও করিয়েছেন। এরপর টাইব্রেকারের প্রথম শটে বল পাঠান জালে। ফলে ম্যাচ সেরার পুরস্কার এই আর্জেন্টাইন অধিনায়কের দখলে। চরম নাটকীয়তায় ২-২ এ ৯০ মিনিটে খেলা শেষ হয়। এরপর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে আর গোল না হওয়ায় খেলা গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। ১৩ ডিসেম্বর রাত ১টায় সেমিতে তাদের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া।
টাইব্রেকার ঠেকানোতে দক্ষ এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। গত বছর কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার তিনটি শট ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলে আলোচনায় আসেন। পরশু রাতে লুসাইল স্টেডিয়ামে তিনি ডাচদের প্রথম দু’টি শট রুখে দেন। প্রথমে ডান দিকে শরীর ফেলে ঠেকান ভিরজিল ভ্যান ডিকের শট। এরপর স্টিফেন বারজিউসের শট আটকান বামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ততক্ষণে ম্যাচে চালকের আসনে আর্জেন্টিনা। অবশ্য পরের দিন শটে একে একে অ্যাস্টন ভিলার এই গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন ওয়ুট ওয়েগহোস্ট, তেগুন কপমেইনার্স ও লুক ডি জং। আর্জেন্টিনার মেসি, পারদেস, মনতিয়েলরা গোল করার পর এনজো ফার্নান্দেজের শট বাইরে না গেলে ডাচদের আর পঞ্চম শট নিতে হতো না। তখনই জিতে যেত লিওনেল স্ক্যালোনির দল। কিন্তু মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করা এই মিডফিল্ডারের শট পোস্ট ঘেঁষে যায়। তাই লাউতারো মার্টিনেজের ওপর বর্তায় শেষ শটে দলকে পার করানোর।
কাতার বিশ্বকাপে একেবারেই বাজে ফর্ম লাউতারো মার্টিনেজের। ফলে এখন তাকে খেলতে হচ্ছে বদলি হিসেবে। পরশু রাতেও তাকে নামানো হয় জুলিয়ান আলভারেজের বদলে। এই ম্যাচেও তার গোল মিস। ১১৯ মিনিটে তার শটে বাধা ডাচ গোলরক্ষক আন্দ্রিস নোপের্ট। তবে দলের হয়ে জয় নির্ধারণী শটে অবশ্য নিজের নার্ভকে শক্ত রেখেছেন। বিপক্ষ কিপারকে বাম দিকে ফেলে ডান পায়ের তীব্র শটে ডান দিকে বল পাঠিয়ে নিশ্চিত করেন দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সেমিতে খেলা। টাইব্রেকারে আগে যে যাই করুক না কেন যার শটে বা যে গোলরক্ষকের কৃতিত্বে জয় নিশ্চিত হয় স্পট লাইট থাকে তার দিকেই। ফলে লাউতারোর দিকেই ছিল অধিকাংশের নজর। তবে ফিফার দুই ক্যামেরাম্যান ছোটেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দিকে।
এই জয়ে ১৯৯০ সালের পর ফের আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে জিতল কোয়ার্টার ফাইনাল। সেবার তারা গোলরক্ষক সার্জিও গয়কোচিয়ার দুই শট ঠেকানোর কল্যাণে যুগোশ্লাভিয়াকে হারিয়েছিল। সে সাথে পরশু রাতে আর্জেন্টিনা প্রতিশোধ নিলো ডাচদের কাছে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে হারের।
তবে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর কথা ছিল না। এমনকি টাইব্রেকারের আগেই জিতে যেতে পারত আর্জেন্টিনা। ৭৩ মিনিটে ২-০ গোলে লিড নিয়ে ৮২ মিনিট পর্যন্ত এই স্কোর লাইনে এগিয়ে মেসিরা। অথচ তারাই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারার শেষ ৭ মিনিট এবং ১০ মিনিট ইনজুরি টাইমে। ডিফেন্সের ভুলে নেদারল্যান্ডসের বদলি স্ট্রাইকার ওয়ুট ওয়েগহোস্ট ৮৩ ও ১০১ মিনিট ( ইনজুরি টাইমের ১১তম মিনিট) দুই গোল করে খেলাকে নিয়ে যান পেনাল্টি শুটআউটে। প্রথমটি দারুণ ড্রপ হেডে। পরেরটি বুদ্ধিদ্বীপ্ত মাটি ঘেঁষে আসা ফ্রি-কিকে বাম পায়ের প্লেসিংয়ে। আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি অযথাই হেডের সময় হাত দিয়ে বিপক্ষ ফুটবলারকে ধাক্কা দিয়ে ফ্রিকিকের জন্ম দেন।
আর্জেন্টিনা ৩৩ মিনিটে এগিয়ে যায় নাহুয়েল মলিনার গোলে। মেসির পাস থেকে বল পেয়ে বাম পায়ের শটে গোল করেন অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদে খেলা এই রাইটব্যাক। ৭৩ মিনিটে মার্কুস একুনা বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি থেকে আসরে নিজের চতুর্থ গোল করেন মেসি। সে সাথে স্পর্শ করলেন আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে করা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ১০ গোলকে। এ নিয়ে তিন ম্যাচের সেরা হলেন তিনি।
৯০ মিনিটের খেলা ২-২ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ পুরোটাই ছিল আর্জেন্টিনার। এই সময়ে তাদের ৭টি চান্স মিস হয়। এর মধ্যে ১২০ মিনিটে জুলিয়ান আলভারেজের শট পোস্টে লাগায় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে।