কিংসলে কোম্যানের শট রুখে দিয়েছে নিজে। এর পর আউরিলিয়ান তোউচুমানের শট বাইরে মারার পর লিসান্দ্রো পারেদেসের শট জালে। এর পরই তার দুই গালে হাত রেখে আগাম উল্লাসের প্রস্তুতি নিতে বলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তাকে জানিয়েছিলেন, ‘আমি পরের শটটি ঠেকিয়ে দিচ্ছি।’ কিন্তু ফ্রান্সের বদলি রেন্ডাল কোলো মুয়ানির শট অল্পের জন্য আটকাতে ব্যর্থ আর্জেন্টিনার এই টাইব্রেকারে ঠেকানোর ওস্তাদ। তাই গনজালো মনটিয়েল শট জালে যাওয়ার সাথে সাথেই আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের উল্লাস। এর মধ্যমণি ছিলেন লিওনেল মেসি। চলমান বিশ্বের এই সেরা ফুটবলারের আগেই ঘোষণা দেয়া, ‘কাতারই হবে আমার শেষ বিশ্বকাপ।’ তাই তার শেষটা বিশ্বকাপ জিতে হবে কি না এ নিয়ে শঙ্কাটা প্রবল হয় প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে ১-২ গোলে হেরে। সেই দলকে এর পর বলতে গেলে একাই টেনে নিয়ে ফাইনালে করলেন জোড়া গোল। এর পর টাইব্রেকারের প্রথম শটেই বল জালে পাঠানো। বাকিটা মনিটয়েলে সমাপ্ত হওয়ার পর ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতা আর্জেন্টিনার। আর তা লিওনেল মেসির হাত ধরেই। এমন সমাপ্তিটা কয়জনের ভাগ্যে জোটে।
২০০৬ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু মেসির। সেবার তাকে বদলি হিসেবেই খেলাতেন কোচ হোসে লুসই পেকারম্যান। কোয়ার্টার ফাইনালে মেসিকে না নামানো এবং পরে লিড নেয়া ম্যাচ ১-১ এ শেষ হওয়া এবং টাইব্রেকারে জার্মানির কাছে হার। এতে সমালোচনার মুখে পড়েন পেকারম্যান। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে মেসি চার গোল করলেও ফাইনালে গোল মিস করেছেন। দলও হেরে যায় জার্মানির কাছে। এর পর ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন মেসি। সবার একই কথা ‘ফাইনালে জ্বলে উঠতে পারেন না মেসি।’ ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে দ্বিতীয় রাউন্ডে হারের ম্যাচেও মেসি কোনো গোল করতে পারেননি। যদিও তার পাস থেকেই দুই গোল। মাঝেতো সমালোচনা সইতে না পেরে জাতীয় দলে আর না খেলারই ঘোষণা দেন। পরে অবশ্য সিদ্ধান্ত পাল্টান।
বিশ্বকাপের সাথে দক্ষিণ আমেরিকান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ কোপা আমেরিকাও জেতা হচ্ছিল না আর্জেন্টিনার। এর আগে তাদের সর্বশেষ বিশ্বকাপ জেতা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। আর কোপা আমেরিকা হাতে নেয়া ১৯৯৩ সালে। শেষ পর্যন্ত মেসির নেতৃত্বে গত বছর ব্রাজিলের মাঠে তাদেরকে ১-০তে হারিয়ে কোপা আমেরিকার জয়। এর পর পরই দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরো চ্যাম্পিয়নদের ম্যাচ কোপা ফাইনালেসিমায় ইতালিতে ৩-০তে উড়িয়ে দুই মহাদেশ সেরার মর্যাদা পায় আর্জেন্টিনা।
বাকি ছিল বিশ্বকাপ পুনরুদ্ধার। মেসি নিজেই ২০২২ এর আসরকে নিজের শেষ বিশ্বকাপ বলায় চ্যালেঞ্জ ছিল তাই এই সেরা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়টা সুখকর হবে তো। শিরোপার উল্লাস করতে পারবেন তো। বহু নামীদামি ফুটবলারের এই বিদায়টা হয়েছে লজ্জা অপমান আর হারে। কিন্তু আপাদমস্তক ভদ্র লোক এবং কোনো কেলেঙ্কারিতে না জড়ানো মেসির বিদায়টা বিশ্বকাপ জিতেই হলো। এটি তার ফুটবল ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন। এই শেষটা ট্রফি জিতে হওয়ায় তাকে বলাই যায় ম্যারাডোনার সমকক্ষ।
দিয়েগো আরমান্ডোর ম্যারাডোনা চার বিশ্বকাপ খেলে আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ সালে একক নৈপুণ্যে চ্যাম্পিয়ন করিয়েছেন। ১৯৯০ সালের ফাইনালে তুলেছিলেন। মেসি ২০১৪ সালে দলকে ফাইনালে তুলেও শিরোপা জিততে পারেননি। এবার তার সাথেই শেষ বিশ্বকাপ খেলে ফেললেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রবার্ত লেভানদভস্কি, ম্যানুয়েল ন্যুয়াররা। সাথে নেইমার যদি শেষ বিশ্বকাপ খেলে ফেলার সিদ্ধান্ত না পাল্টান তা হলে কাতারই হয়ে যাবে তার শেষ বিশ্বকাপ। তাই মেসির জন্য চ্যালেঞ্জই ছিল বিশ্বকাপ জিতে গ্রেটেস্ট ফুটবল আর্থ নামের এই টুর্নামেন্ট শেষ করা।

 

মেসির ক্যারিয়ারে যত শিরোপা আর্জেন্টিনা
১. ফুটবল বিশ্বকাপ : ২০২২
২. কোপা আমেরিকা : ২০২১
৩. কনমেবল উয়েফা কাপ চ্যাম্পিয়নস: ২০২২
বার্সেলোনা :
১. লা-লিগা : ২০০৪-০৫, ২০০৫-০৬, ২০০৮-০৯, ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১২-১৩, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯
২. কোপা দেল রে : ২০০৮-০৯, ২০১১-১২, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮, ২০২০-২১
৩. উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ : ২০০৫-০৬, ২০০৮-০৯, ২০১০-১১, ২০১৪-১৫
৪. ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ : ২০০৯, ২০১১, ২০১৫
প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন :
১. লিগ ওয়ান: ২০২১-২২
ব্যক্তিগত অর্জন :
১. ব্যালন ডি’অর : ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯, ২০২১
২. গোল্ডেন বল : ২০১৪, ২০২২
৩. ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় : ২০০৯
৪. ফিফার সেরা পুরুষ খেলোয়াড় : ২০১৯