হতদরিদ্র ভ্যানচালকের মেয়ে জান্নাতুম মৌমিতা মুন্নী। তিনি ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু ডাক্তারি পড়া নিয়ে অশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে মুন্নীর। কারণ ভ্যানচালক বাবার পক্ষে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করানোর অর্থ জোগান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে ডাক্তারি পড়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত মুন্নীর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না তা অনিশ্চিত।
মুন্নী পাবনা মেডিক্যাল কলেজ কেন্দ্র থেকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জাতীয় মেধাক্রমে ৩,১১০তম হন। ভর্তি পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৬৯.৭৫ নম্বর। দিনাজপুরে এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
মুন্নীর বাড়ি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার তাঁতীবন্দ ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামে। বাবা বাকীবিল্লাহ পেশায় একজন ভ্যানচালক। মা রওশন আরা খাতুন গৃহিনী। চার ভাই বোনের মধ্যে মুন্নী বড়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা বাকীবিল্লাহ।
মুন্নীর বাবার বাড়িতে দু’কাঠা জমি ছাড়া তেমন কিছুই নেই। বাড়িতে রয়েছে একটি ছোট টিনের ঘর। ওই ঘরেই থাকেন পরিবারের সবাই। নুন আনতে পান্তা ফুরায় মুন্নীদের পরিবারের। মেডিক্যালে ভর্তি ও পড়ার খরচ জোগানোর সামর্থ্য তার বাবার নেই। জন্মের পর থেকেই সংসাবে অভাব-অনটন দেখে বড় হয়েছেন মুন্নী। অদম্য মেধাবী মুন্নী অভাবের সংসারে জন্ম নিলেও সাফল্যের সাথে পড়ালেখা চালিয়ে আসছেন। রেখেছেন মেধার স্বাক্ষর, যা শিক্ষক, অভিভাবক, সহপাঠী ও প্রতিবেশীদের দৃষ্টি কেড়েছে। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পুরো এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তাকে ঘিরে। কিন্তু এই আনন্দের মধ্যেও মুন্নী ও তার মা-বাবার দুশ্চিন্ত শেষ পর্যন্ত মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ হবে তো?
মুন্নীর বাবা বাকীবিল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, একটি এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা লোন নিয়ে একটি ভ্যান কিনেছি। ভ্যান চালিয়ে দিনে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা পাই। এ টাকা দিয়েই কোনোরকমে পরিবারের ছয়জনের খাবার জোগাই। সংসারের অন্য খরচও চালাতে হয়। সংসার চালানোই যেখানে দায় সেখানে মেয়ের মেডিক্যালে লেখাপড়ার খরচ চালানো আমার কাছে দুঃস্বপ্ন। তবে স্বপ্ন দেখি আমার মেয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু টাকার অভাবে মেয়েকে ভর্তি করাতে পারবো কি না জানি না।
মুন্নী পোড়াডাঙ্গা হাজী এজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ওপাবনা সরকারি অ্যাডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ছোট থেকেই তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। স্বপ্ন পূরণে তিনি অধিকাংশ সময়ই লেখাপড়ার পেছনে সময় ব্যয় করেছেন। স্বপ্ন পূরণের এত কাছে এসেও টাকার অভাবে স্বপ্ন ভেঙে যাবে তা মেনে নিতে পারছেন না মুন্নী। ডাক্তার হয়ে গরিব মানুষের সেবা করার প্রবল ইচ্ছা তার।
মুন্নী জানান, স্কুল ও কলেজে পড়াশুনার সময় অর্থের অভাবে একসাথে প্রয়োজনীয় সব বই কিনতে পারতাম না। একটা একটা করে বই কিনতাম। মন চাইলে একটা ভালো পোশাক কিনতে পারতাম না। কারণ আমার জন্ম গরিবের ঘরে। মা-বাবা খুশি হয়ে যা কিনে দিতেন, আমি তাতেই খুশি থাকতাম।
দিনাজপুরে এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পাবনা থেকে গিয়ে দিনাজপুরে থাকা খাওয়া ও পড়তে অনেক টাকা লাগবে। এত টাকা তিনি কোথা থেকে পাবেন- এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে মুন্নীর।
পোড়াডাঙ্গা হাজী এজেম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ১৯৮৪ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলেও ৩৬ বছরে এই বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী সরকারি মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পায়নি। কিন্তু এবারে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী মেয়ে মুন্নী সুযোগ পাওয়ায় আমরা গর্বিত। মুন্নী আমাদের বিদ্যালয়সহ ইউনিয়নবাসীর মুখ উজ্জ্বল করেছে। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে অবশ্যই মুন্নীর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে বলে আমার বিশ্বাস।
পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. হুমায়ুন কবির মজুমদার বলেন, আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমাদের ছাত্রী মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। তার দারিদ্রতা যেন তার লেখা পড়ার অন্তরায় না হয়, তা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিদের খেয়াল রাখার আহ্বান জানান তিনি।






