লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মেঘনার স্রোতের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চোখের সামনেই নদীতে ভেঙে পড়ছে হাটবাজারের দোকানঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মক্তব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলের মাঠ, ঘরবাড়িসহ বিস্তীর্ণ জনপদ।
চলতি বর্ষা মওসুমের শুরুতেই নদীর ভাঙন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়নের নাছিরগঞ্জ বাজারের প্রায় অর্ধেকের বেশি দোকানঘর ইতোমধ্যেই নদীতে বিলিন হয়ে গেছে।
মারাত্মক হুমকির মুখে বাজারের অবশিষ্ট দোকানপাট, বাজার এলাকার চরকালকিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি জামে মসজিদ, মক্তব, মোবাইল টাওয়ার, লোকালয়ের বসতবাড়িসহ বিস্তীর্ণ জনপদ।
সম্প্রতি একনেকের সভায় রামগতি ও কমলনগর রক্ষায় একটি প্রকল্প অনুমোদন হলেও কাজ শুরুর আগে আরো কী পরিমাণ ভেঙে পড়ে এমন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে তীরবর্তী মানুষের। দিশেহারা ব্যবসায়ী ও স্থানীয় এলাকাবাসী নিজস্ব উদ্যোগে ‘জংলাবাঁধ’ দিয়ে চেষ্টা করে শেষ রক্ষা হচ্ছে না। ভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন এলাকাবাসী।
নাছিরগঞ্জ বাজারের ঘর-মালিক ও স্থানীয় চরমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্যানেল
চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মেম্বার বলেন, পাঁচ কিলোমিটার দূরে থাকা মেঘনা এখন এ বাজারের দোকান-ঘর, স্বপ্নের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে নিয়ে যায়। তালতলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কাওমি মাদরাসা ও জামে মসজিদসহ বাজারটি বিলীন হওয়ার পথে।
ভাঙনের শিকার আবুল কাশেম মেম্বারসহ ক্ষতিগ্রস্তরা বলেন, এবারের মেঘনার ভাঙনের ভয়াবহতা বিগত সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেশি। গত ১০ বছরে লক্ষাধিক মানুষ মেঘনায় ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছে। সবশেষ গত দু’বছর মেঘনার ভাঙন ছাড়াও লোকালয় ও ফসলি জমিতে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে। চলতি বছরে নতুন সমস্যা যোগ হয়েছে জোয়ারের পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা। এমন পরিস্থিতিতে ভাঙনকবলিত মেঘনাপাড় এলাকায় স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি তাদের।
স্থানীয় সূত্রে আরো জানা যায়, লক্ষ্মীপুর সদর এবং কমলনগর উপজেলার পশ্চিম সীমানার উত্তর-দক্ষিণ এবং রামগতি উপজেলার পশ্চিম ও দক্ষিণ বরাবর মেঘনা নদী বহমান। কমলনগর উপজেলায় মেঘনার দৈর্ঘ্য ১৭ কিলোমিটার এবং রামগতিতে ২০ কিলোমিটার। দুই উপজেলার ৩৭ কিলোমিটার মেঘনা নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রতিনিয়ত চলছে ভাঙন। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদনে সাবেক রামগতি (রামগতি-কমলনগর) উপজেলার আয়তন ছিল ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার। ২০ বছর পর ২০১১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদনে সে আয়তন উল্লেখ করা হয় ৫৯৪ বর্গকিলোমিটার। যাতে দেখা যায় ২০ বছরে মেঘনায় বিলীন হয়ে যায় ৬৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা। ২০১১ সালের পর আর কোনো আদমশুমারি হয়নি। এর মধ্যে এ অঞ্চলে নদীভাঙনের গতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
কমলনগর উপজেলা মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চর ফলকন সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা হাবিব উল্ল্যাহ বাহার জানান, তার লুধুয়াবাজারের মাদরাসাটি ভাঙনের শিকার হলে ফলকন বোর্ডঅফিস এলাকায় স্থানান্তর করা হয়।
তিনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যে নদীভাঙন প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টেকসই বাঁধ নির্মাণে একনেকে সরকার একটা বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। এ ফাইলটি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে এ এলাকার মানুষের ভিটেমাটি রক্ষা করা জরুরি।
কমলনগর-রামগতি আসনের সংসদ মেজর (অব) আবদুল মান্নান বলেন, দু’উপজেলার নদীভাঙন রোধ করতে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। আশা করি প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর তীররক্ষা করা সম্ভব হবে। আমি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ কাজটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পত্র পাঠানো হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, জেলার চরটি উপজেলা উপকূলীয় হলেও রামগতি এবং কমলনগরে নদী ভাঙছে।
তিনি আরো জানান, দুটি উপজেলার মেঘনা নদীর ৩১ কিলোমিটার তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিন হাজার ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পটির অর্থছাড় পেলে বাঁধের কাজ শুরু হবে বলেও জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তা।






