ইভটিজিংয়ের ঘটনায় থানায় অভিযোগ জানিয়ে পুলিশের সাথে বের হওয়ার পরে হামলা হয়েছে ফরিদপুরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম-সদস্য সচিব বৈশাখী ইসলাম বর্ষা ও তার বাবা বাবু শেখের ওপরে। পরে সন্ধ্যায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে গেলে অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশসহ ভুক্তভোগীদের উপরেও ফের হামলা চালায়। এতে পুলিশসহ অনেকে আহত হয়েছেন।
শুক্রবার (৩০ মে) বেলা ১২টার দিকে স্থানীয়দের নিয়ে উভয় পক্ষের বসার কথা ছিলো। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও অপর পক্ষ না আসায় ওই সালিশ হয়নি। এ অবস্থায় বর্ষা ও তার বাবা বাবু শেখ নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানাতে যায়।
জানা গেছে, নগরকান্দার ফুলসূতী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণি পড়ুয়া এক মেয়েকে উত্তক্ত করার ঘটনায় স্থানীয়দের কাছে অভিযোগ জানায় বর্ষার পরিবার।
বর্ষার মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘ইউএনও স্যারের সাথে দেখা করে বিষয়টি জানানোর পরে তিনি তাদের নগরকান্দা থানায় যেতে বলেন। এরপর তারা নগরকান্দা থানায় যাওয়ার পরে ৬ জন পুলিশের একটি দল তাদের নিয়ে ভবুকদিয়ায় যায়। তবে তারা ভুবকদিয়া বাজারে পৌঁছানোর পরপরই বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সেকেন গাজী, সাগর গাজী, ইমরান, জামাল ব্যাপারীসহ তাদের লোকেরা পুলিশের উপস্থিতিতেই বর্ষা ও তার বাবার উপরে হামলা চালায় বলে ফাতেমা বেগম অভিযোগ করেন।’
এ ঘটনার পর বৈশাখী ইসলাম বর্ষা ফেসবুক লাইভে হামলার বর্ণনা তুলে ধরেন।
এ সময় বর্ষা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি একটা ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করাতে তারা আমাকে ইচ্ছামতো মেরেছে। চুল ধরে টেনেছে। আমাকে রাস্তায় ফেলে লাথি মেরেছে। আমার আব্বুকে মারতেছে। আমি খুব বাজে অবস্থায় আছি। আমি কি করবো বুঝতে পারতেছি না।’
এ হামলার সাথে বিএনপির লোকেরা জড়িত অভিযোগ করে বর্ষা এ সময় আরো বলেন, ‘বিএনপির লোকেরা আমাদেরকে মেরেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্র আন্দোলন করেছি। এখন বুঝতেছি আন্দোলন করাই আমার ভুল ছিল। আন্দোলন করার কারণে তারা এই হামলা করেছে।’
এদিকে বর্ষার এ ভিডিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহযোগীরা সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করলে বিষয়টি ভাইরাল হয়। পুলিশ বিকেলের পর ভবুকদিয়া বাজারে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ছয়জনকে আটক করে। তবে তাদেরকে থানায় নিয়ে আসার পথে হামলাকারীদের পক্ষ অবলম্বন করে স্থানীয় কিছু লোক পুলিশকে বাধা দেয়।
অন্যদিকে, এসময় খবর পেয়ে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ছাত্র প্রতিনিধিরা ভবুকদিয়া বাজারে গেলে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভবুকদিয়া বাজারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের ছাত্রদের উপর লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায়। এসময় হামলায় পুলিশসহ কয়েকজন আহত হয়। বেশ কিছুক্ষণ পরে পুলিশ সেখান থেকে ছয় জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে।
আটকরা হলো- আরিফ হোসেন(২৩), আজিজুল শেখ( ১৫), শরিফ শেখ(১৯), সজিব শেখ( ২৪), রাসেল শেখ(১৯) ও সাজ্জাদ শেখ( ১৬)। এদের সবার বাড়ি নগরকান্দার ভবুকদিয়ায়।
জানা গেছে, বর্ষার পরিবারের ইভটিজিংয়ের ঘটনা নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক বদিউজ্জামান তারা মোল্লার উপস্থিতিতে সালিশ হওয়ার কথা ছিলো। তবে তারা মোল্লা নির্ধারিত সময়ে সেখান থেকে আরো পাঁচ কিলোমিটার দুরে নাড়ুয়াহাটি নামকস্থানে আরেকটি সালিশে উপস্থিত থাকায় তিনি এই সালিশে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
এদিকে, দুপুরে বর্ষা ও তার পরিবারের উপর হামলাকারীদের আটক করে নিয়ে আসার পথে সন্ধ্যায় ভবুকদিয়া বাজারে পুলিশের ওপরে আওয়ামী লীগ নেতার ভাই ফরহাদ মাতুব্বরের নেতৃত্বে হামলা করা হয় বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, ফরহাদ মাতুব্বরের ভাই মুরাদ মাতু ডাঙ্গী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একাংশের আহ্বায়ক। বিগত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মুরাদ হাওলাদার স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা জামাল হোসেন মিয়ার সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন। তবে হামলার পর পুলিশের ব্যাপক অভিযানের পর ফরহাদ ও তার লোকজন আত্মগোপনে চলে যায়।
এ ব্যাপারে জানতে নগরখানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: সফর আলীর মোবাইলে ফোন দিলে তার ফোনটি ব্যস্ত পাওয়া যায়।
অপরদিকে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: কাফী বিন কাদিরের মোবাইলে ফোন দিলে তিনি বলেন, ‘আমি ভবুকদিয়াতে একটি বড় ঘটনার ঝামেলাতে আছি। আপনার সাথে একটু পরে কথা বলছি।’
রিপোর্ট লেখার সময় রাত ১০টার দিকে এ ঘটনার জের ধরে ভবুকদিয়া ও পাশের এলাকায় উত্তেজনা চলছিলো। পুলিশসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য।






