টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে বিরাট কোহলিকে চাপে ফেলে দিলো ইংল্যান্ড। সম্প্রতি ভারত অধিনায়কের একটি মন্তব্যকে টুইস্ট করে এক সাক্ষাৎকারে ইংলিশ বোলার জেমস অ্যান্ডারসন জানিয়েছেন, ‘বিরাট কোহলি যদি বলে আসন্ন টেস্টে সিরিজে ওর রান পাওয়া কিংবা না পাওয়ার ওপরে ভারতের কিছু যায় আসে না, তাহলে আমি বলব ও ডাহা মিথ্যে কথা বলছে। হয়তো নিজের ওপর থেকে চাপ কমানোর জন্যই। কিন্তু সে বোধহয় জানে না, এতে আখেরে ওর কোনো লাভ হবে না। কারণ এবারও বিরাটের জন্য আমরা কৌশল সাজিয়ে রেখেছি।’

ইংল্যান্ডে পৌঁছে কোহলি তার দলের শক্তি বোঝাতে বলেছিলেন, তিনি রান না পেলেও তাতে দলের অসুবিধা হবে না। দল জিতলেই তিনি খুশি হবেন।

এই বক্তব্যের সূত্র ধরে অ্যান্ডারসন আরো বলেন, ‘বিরাট কোহলি যতই অস্বীকার করুক আমি মনে করি, ওর রানের ওপরেই সিরিজে ভারতের ভাগ্য নির্ভর করবে। সন্দেহ নেই বিরাট বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন এবং লড়াকু ক্যাপ্টেন। সে এবার এখানে রান পেতে এবার মরিয়া থাকবে। তবু ওর প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, ওকে আমরা সফল হতে দেব না।’

২০১৪ সালের ইংল্যান্ড সফর কোহলির ক্যারিয়ারে একটা কালোদাগ হয়ে থাকবে। সেবার চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছিলেন অধিনায়ক। ছয়টি ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ১৩৪ রান। গড় ১৩.৪। ওই সিরিজে তার সর্বাধিক রান ছিল ৩৯। ২০১৬-১৭ মৌসুমে ফিরতি সিরিজে ঘরের মাঠে অবশ্য ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ টেস্টে কোহলি করেছিলেন ৬৫৫ রান। কিন্তু তাতেও ২০১৪ সালের ব্যর্থতা ঢাকা পড়েনি। সেবার ভারতীয় তারকাটিকে রীতিমতো নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলেন জেমস অ্যান্ডারসন। কোহলির ৬ ইনিংসের মধ্যে অ্যান্ডারসনই তাকে সাজঘরে ফিরিয়েছিলেন চারবার। এছাড়া ক্রিস ব্রড ও ক্রিস জর্ডন দু’বার করে আউট করেছিলেন কোহলিকে। তার আগে ২০১২ সালেও কোহলিকে পাঁচবার আউট করেছিলেন অ্যান্ডারসন। ৩৫ বছরের এই বিপজ্জনক ইংল্যান্ড পেসার এবারও সেই দাপট দেখাতে প্রত্যয়ী।

৫৪০টি টেস্ট উইকেটের মালিক অ্যান্ডারসন চোট সারিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে নামছেন। তার আগে অ্যান্ডারনের বার্তা খুবই পরিষ্কার- ‘কোহলিকে তাড়াতাড়ি প্যাভিলয়িনে ফেরাতে পারলেই ইংল্যান্ডের সিরিজ জয়ের কাজ সহজ হয়ে যাবে। চার বছর আগের মতো এবারও সেই কাজটি আমরা নিপুণ ভাবে সেরে ফেলতে প্রস্তুত।’

পাশাপাশি কোহলির প্রশংসা করে ‘জিমি’ বলেছেন, ‘গত সফরে টেস্ট সিরিজে বিরাট রান পায়নি ঠিকই, তবে তাতে ওর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। চার বছর আগের ভিডিও ফুটেজ ও অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ও যে এবার সর্বশক্তিতে ঝাঁপাবে, সেটা আমরা জানি।’

উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডের মাটিতে এবার বিরাটের সফল হওয়ার যথেষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সীমিত ওভারের দুটি সিরিজে। টি-২০ এবং ওয়ান ডে মিলিয়ে ৬টি ম্যাচে ৩০১ রান করেছেন তিনি।

এই গ্রীষ্মে মাত্রাতিরিক্ত গরম পড়েছে ব্রিটিশ আইল্যান্ডে। গত কয়েক দশকে এত বেশি গরম সহ্য করতে হয়নি ইংরেজ জনগণকে। ফলে এখন সেখানকার আবহাওয়া অনেকটাই ভারতের মতো। সেই প্রসঙ্গে অ্যান্ডারসন বলছেন, ‘এবার অতিরিক্ত গরমটা ভারতীয় দলের কাছে নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর ফলে বাইশ গজের চরিত্রের বড় কোনো পরিবর্তন ঘটবে বলে আমি মনে করি না। উইকেটে এবারও অন্যান্যবারের মতোই গতি ও সুইং থাকবে, যার মোকাবিলা করতে হবে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের। বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে ওদের পেসারদেরও।’

ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজে ভালো ফল করতে হলে ভারতীয় পেসারদের যে জ্বলে উঠতেই হবে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু লিডসে ওয়ান ডে সিরিজের শেষ ম্যাচে ভুবনেশ্বর কুমার চোট পেয়ে ছিটকে যাওয়ায় টেস্টের আগে বেশ চাপে ভারতীয় শিবির।

 

আরো পড়ুন : সিনিয়রদের পারফরম্যান্সেই বিস্ফোরণ

আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে যাচ্ছেতাই অবস্থা। ওয়ানডে সিরিজে কী হবে সেটা আগাম যেন অনেকেই ঠোঁটের কাছে এনে রেখে দিয়েছিলেন। মুখ খুলে বলতে গিয়েও বলেননি মাশরাফির জন্য। কারণ মাঝে স্ত্রীর অসুস্থতার জন্য মাশরাফি ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাবেন কি না সেটা নিয়েই ছিল প্রশ্ন। অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে যান ওয়ানডে অধিনায়ক। ওয়ানডে সিরিজ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে ক্রিকেটারদের কাটা ঘায়ে যেন লবণের ছিটা দেয়ার মতো কথা বলেছিলেন সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। সিনিয়র ক্রিকেটাররা নাকি টেস্টম্যাচই খেলতে চান না। সাকিব, মুস্তাফিজের নাম ধরেই উচ্চারণ করেছেন তিনি। সাথে সিনিয়র ক্রিকেটার শব্দটাও উচ্চারিত হয়। সেটাতে যে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তা প্রভিডেন্সের পারফরম্যান্সের বিস্ফোরণেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। যে ম্যাচে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজে তাদের মাটিতে বিধ্বস্ত করেছেন সেটাতে সিনিয়রদেরই ছিল দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। সাকিব, তামিম, মুশফিক ও মাশরাফি। এ চার ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সেই ম্যাচটা জিতেছে বাংলাদেশ। বুঝিয়ে দিয়েছেন ইচ্ছে হলে সবই সম্ভব এবং টেস্ট সিরিজও যে ভালো করা সম্ভব ছিল এবং কিছু নিজস্ব প্রবলেমের জন্য হয়নি সেটাই।

আসলে বাংলাদেশ দল এখন সিনিয়র-নির্ভর হয়ে গেছে। সাফল্য পেতে হলে সিনিয়রদেরই পারফরম্যান্স করা চাই। নতুবা নয় এমন অবস্থা হয়ে গেছে। নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ দলের ব্যর্থতার জন্য তখনকার হেড কোচ হাতুরাসিংহে সিনিয়র ক্রিকেটারদের সরাসরি দোষারোপ করেছিলেন। সিনিয়ররাও উত্তর দিয়ে দেন। যে সবসময় সিনিয়রদেরই যদি পারফরম্যান্স করে দলের সাফল্য এনে দিতে হয় তাহলে আর জুনিয়ররা কেন? সে থেকেই সিনিয়ররা ভালো করলেই রেজাল্ট নতুবা ব্যর্থতা। কেন এ অবস্থাÑ তার উত্তর নেই। একটা দলে ১১ জন ক্রিকেটার। সবাইকেই পর্যায়ক্রমে পারফরম্যান্স করে দেখাতে হয়। সব দিন সব ক্রিকেটার ভালো করতে পারবেন না এটাই স্বাভাবিক। যেমনটা ওই ম্যাচে। ব্যাটিংয়েরই সুযোগ পাননি সাকিব, তামিম, এনামুল জুনিয়র, মুশফিক ছাড়া। মাহমুদুল্লাহ খেলেছেন এক বল। তাহলে যখন তারা ব্যর্থ হবেন তখন তো অন্যদের দায়িত্ব নিতে হবে। তখন যদি তারা ব্যর্থ হন তাহলে সে কৈফিয়ত দেবে কে? এখনো তামিম, সাকিব ও মাশরাফির বিকল্প তৈরি হয়নি। কিভাবে ভালো রেজাল্ট আসবে ধারাবাহিকভাবে।

টেস্টম্যাচেও সে একই অবস্থা। তামিম, সাকিবরা ভালো করেননি তো তরুণরা কেউই দায়িত্ব নিতে পারেননি। দুই টেস্টের চার ইনিংসে চরম ব্যর্থতা দেখিয়েছেন। শঙ্কা ছিল ওয়ানডে সিরিজ নিয়েও। সিনিয়ররাই সে থেকে উত্তরণ ঘটালেন। কিন্তু দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও সাকিব, তামিমরা ভালো করবেন। দুই শতাধিক রানের পার্টনারশিপ খেলবেন এমনটা তো নয়। অথচ ক্রিকেটারদের বাজে পারফরম্যান্সের দায়ভার যেন সব সিনিয়রদেরই। বড় দলগুলোতেও এমনটা আছে। যে সিনিয়ররা ভালো খেলেন, তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে। কিন্তু তাদের পাশাপাশি তরুণরাও দুর্দান্ত খেলেন। বাংলাদেশ দলের তরুণরা সিনিয়রদের প্রশংসা করেন। তাদেরকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ তারা প্রতিনিয়ত দেন সেটাও তারা জানান। কিন্তু দায়িত্ব কেন তারা নিতে পারেন না সেটা বোধগম্য নয়।

নির্বাচকেরা বরাবরই বলেন, দেশের সেরা ক্রিকেটারদের নিয়েই দল গঠিত হয়। এটাও বাস্তব। কিন্তু কিছু ক্রিকেটার রয়েছেন যারা জাতীয় দলের জার্সি পরিধান করে খেলতে নামলেই তাদের পারফরম্যান্সে দুরবস্থা দেখা যায়। ঘরোয়া ক্রিকেটে তারাই আবার সবাইকে ছাড়িয়ে এগিয়ে থাকেন। কিন্তু সময়মতো সুবিধা করতে পারেন না। দলে এখন দু’জন অভিজ্ঞ কোচ রয়েছেন। একজন হেড কোচ স্টিভ রোডস। অন্যজন ব্যাটিং পরামর্শক নেইল ম্যাকেঞ্জি। এ ব্যাপারটা তারাও খেয়াল করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ সম্মিলিত পারফরম্যান্স ছাড়া ধারাবাহিক ফল আসে না। বাংলাদেশ দলের ধারাবাহিক সফলতা বড্ড প্রয়োজন- সেটা নানা কারণেই!