মো: আজিজুল হক গাজীপুর

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাড়ছে ধান, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন। কিন্তু যে বীজের ওপর দাঁড়িয়ে এই কৃষি উৎপাদন- সেই বীজেই রয়ে গেছে বড় ধরনের বিদেশনির্ভরতা। দেশে ব্যবহৃত পাটবীজের প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ, ভুট্টাবীজের ৯০-৯৫ শতাংশ, তেলবীজের ৮৫-৯০ শতাংশ, ডালের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং সবজিবীজের প্রায় ৬০ শতাংশ বিদেশ থেকে আসে। ফলে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি বীজ নিরাপত্তায় তৈরি হচ্ছে নতুন প্রশ্ন- বিদেশী সরবরাহে কোনো বড় ধরনের বিঘœ ঘটলে দেশের কৃষি উৎপাদন কতটা নিরাপদ থাকবে?
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বীজের ওপর অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। কারণ বীজ শুধু কৃষির একটি উপকরণ নয়, বরং পুরো কৃষি উৎপাদনব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি। বিদেশী বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কিংবা জলবায়ুজনিত কোনো সঙ্কটে বীজ আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মাঠের উৎপাদনে।
‘বাংলাদেশে কৃষির টেকসই উন্নয়নে অঞ্চলভিত্তিক কৃষি গবেষণা ও বীজ উৎপাদনের গুরুত্ব’ শীর্ষক এক বিশ্লেষণে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ ড. জি এম আসাদুর রহমান এবং তালতীর সিড লিমিটেডের বীজ প্রযুক্তিবিদ ড. মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তাদের যৌথ গবেষণায় এমন আশঙ্কার কথাই তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, দেশের এক অঞ্চলের জন্য উপযোগী জাত বা প্রযুক্তি অন্য অঞ্চলে একই ফল দেবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মাটি, পানি, জলবায়ু, ভূমিরূপ, কৃষি-বাস্তুসংস্থান এবং কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে কৃষি গবেষণা ও জাত উদ্ভাবনের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘উপযুক্ত অঞ্চলে উপযুক্ত ফসল, উপযুক্ত জাত এবং মানসম্পন্ন দেশীয় বীজ’- এই নীতিকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের কৃষির পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ গবেষকদ্বয়ের প্রবন্ধে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট বীজের চাহিদা ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ১৪ লাখ টন। ওই অর্থবছরে প্রায় ৩২ হাজার ৩৮৫ টন বীজ আমদানি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয় ৩৬ হাজার ৪৯২ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩১ হাজার ৬৯৪ টন। অর্থাৎ বীজের বাজারে আমদানির উপস্থিতি সামান্য নয়।
ফসলভিত্তিক চিত্রটি আরো স্পষ্ট। দেশে বছরে প্রায় ছয় হাজার থেকে ছয় হাজার ৪০০ টন পাটবীজের চাহিদা থাকলেও চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টন বীজ ভারত থেকে আমদানি করতে হয় বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় পাট উৎপাদক দেশ হয়েও পাটবীজের এমন আমদানিনির্ভরতা কৃষির জন্য একটি দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ভুট্টার ক্ষেত্রেও চিত্রটি প্রায় একই। দেশে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন ভুট্টাবীজের চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১৪ হাজার ৮১৭ টন আমদানি করা হয়। ভুট্টার উৎপাদন গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও সেই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে বিদেশী হাইব্রিড বীজের বড় ভূমিকা রয়েছে।
বীজে পরনির্ভরতার সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু ঝুঁকিও। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে লবণাক্ততা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহের চাপ, কোথাও আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা, আবার হাওর ও চরাঞ্চলে রয়েছে ভিন্ন ধরনের ঝুঁকি। ফলে সারা দেশে একই জাত ও প্রযুক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে অঞ্চলভিত্তিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়ছে।
ড. আসাদুর রহমান ও ড. মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে শুধু উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না; উচ্চফলনশীলতার পাশাপাশি স্থিতিশীল, সম্পদসাশ্রয়ী ও প্রতিকূল পরিবেশসহনশীল জাত উদ্ভাবন করতে হবে। 
বীজ নিরাপত্তায় বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাবও রয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক বীজ উৎপাদন এলাকা, স্থানীয় বীজ রিজার্ভ এবং কমিউনিটি সিড ব্যাংক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত মানসম্পন্ন বীজ দুর্যোগের পর দ্রুত কৃষি পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দিয়েছেন তারা।
তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে অ্যাগ্রো-ইকোলজিক্যাল জোন ও ক্রপ-জোনিংভিত্তিক গবেষণা, মাল্টিলোকেশন ও অন-ফার্ম গবেষণা সম্প্রসারণ, জলবায়ু-সহনশীল জাত উদ্ভাবন, অঞ্চলভিত্তিক সিড প্রোডাকশন জোন, কমিউনিটি সিড ব্যাংক, ডিজিটাল কৃষি ও জিআইএসভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা এবং গবেষণা-বীজ-সম্প্রসারণ-বাজারের সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা।