তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মুল দাবী সাম্য ও মানসিক মর্যাদা সেটাকেই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। যারা অন্যদের উদ্বাস্তু করে তারা নিজেরাই বিবেকের উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রের নীতির কারণেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। প্রশ্ন করতে হবে নিজ বাসভূমে কেন তারা পরবাসী? ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভাষা চর্চার ব্যবস্থা এবং তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ও ভাষার অধিকার সুরক্ষা’ শীর্ষক এক সেমিনারে সুলতানা কামাল এসব কথা বলেন। ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১৯’ উপলক্ষে এএলআরডি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামসহ ১৯টি সমমনা ও অধিকারভিত্তিক সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০১৯ উদযাপন জাতীয় কমিটির উদ্যোগে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে সঞ্জীব দ্রং ও অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌস দুটি পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে প্যানেল আলোচক হিসেবে খুশী কবির, বিচারপতি মো: নিজামুল হক, অ্যাডভোকেট রানাদাশগুপ্ত ও ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।

সুলতানা কামাল আরো বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষদের ইচ্ছাকৃতভাবে দেশ থেকে বিতাড়নের চেষ্টা চলছে। এটা রাষ্ট্রীয়ভাবেও চলছে আবার অ-রাষ্ট্রীয়ভাবেও চলছে। এখানে রাষ্ট্রের একটা প্রচ্ছন্ন মদদ আছে। আর মদদ আছে বলেই এই বিতাড়ন সম্ভব হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে নৃ-গোষ্ঠী মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এই কমে যাওয়ার পেছনে প্রাকৃতিক কোনো কারণ নেই। আছে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতির কারণেই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা কমছে। এসব জাতির মানুষ দেশত্যাগ করছে বা করতে বাধ্য হচ্ছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের সংখ্যা কমানোর প্রক্রিয়া চলছে। অথচ এই প্রবণতা বন্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না।

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে সাংবিধানিকভাবে এবং সার্বিকভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটা সুখকর সংবাদ না। সংখ্যায় কম হওয়ার কারণে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে উদ্বাস্তু করে তুলছি। এক সময় আমরা বিবেকের উদ্বাস্তুতে পরিণত হব।

খুশী কবির বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা যে নীতি, আদর্শ ও বিশ্বাসকে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছে তা ভুলে গেলে চলবে না। সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, সংখ্যালঘু বা বাঙালি কোন পার্থক্য থাকা চলবে না।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, দেশভাগের পরে বাংলাদেশের অনেক হিন্দু পরিবার দেশ ত্যাগ করেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু যারা বাংলাদেশে বসবাস করছে তাদের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জান মালের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার দাবি জানান।

 ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবর্তে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করার কারণে ডেইলী স্টারের একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং সেটা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট আমলে নিয়েছেন উল্লেখ করে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এ ধরণের কোন অপরাধ আমলে নেয়ার এখতিয়ার নেই। আর সংবিধানে আদিবাসী বলা যাবে না এমন কোনো বিধান নেই।

বিচারপতি মো. নিজামুল হক বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে যদি সম্পত্তি আদিবাসীরা ভোগ দখল করে তাহলে সেটার মালিকানা তাদের, এটাই আদিবাসীদের ভূমি অধিকার। তিনি আরো বলেন, এটা বাস্তবতা যে অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৭ ধারার বিধান সম্পর্কে জানেন না। এই ধারায় আদিবাসীদের সম্পত্তির সুরক্ষায় যেসব বিশেষ বিধান অনুসরণ করতে হবে তা সরকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের শুরুতেই জানতে হবে, এটা তাদের কর্তব্য।

এতে মুক্ত আলোচনা পর্বে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত অংশগ্রণকারীদের মধ্য থেকে নরেশ চন্দ্র উরাও, শান্তি বিজয় চাকমা, মনংচিন থানং, বিক্টোর লকড়া, অজয় এ. মৃ, আলপি কুজুর এবং রাজকুমার সাও অংশ নেন। সেমিনারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।