রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের হত্যার ঘটনায় এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ কোথায় গেল, দু’জন কিভাবে চারজনকে হত্যা করলসহ ১৮টি প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় মহানগর নাগরিক কমিটি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে রংপুর সুমি কমিউনিটি সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করে মহানগর নাগরিক কমিটি। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠন সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ। এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগঠনটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোজাহার আলীসহ নেতৃবৃন্দ।

লিখিত বক্তব্যে পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ নিহতদের প্রতিবেশী বিনোদ দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস ও কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করে। এই গ্রেফতার সংক্রান্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ যে বয়ান হাজির করে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দানা বাধতে শুরু করে। পরে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাছে ওই ঘটনার তদন্ত এবং অপরাপর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ১৯টি প্রশ্নের উত্তর দাবি করেন পলাশ কান্তি নাগ।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মাদকসেবী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার লোকলজ্জার ভয়ে কি একের পর এক চারজন মানুষকে খুন করে ফেলা সম্ভব? মাদক সেবনই যদি মূল উদ্দেশ্য হতো, তবে গণপতি চক্রবর্তীর পাশের নির্মাণাধীন (জনশূন্য) বাড়িটিই তো নিরাপদ ছিল। ঝুঁকি নিয়ে বসতবাড়ির ছাদে কেন তারা আসবে?

কোনো ধারালো অস্ত্র ছাড়া শুধু গামছা ও রশি দিয়ে এত দ্রুত চারজনকে খুন করা কিভাবে সম্ভব হলো? অস্ত্র ব্যবহার না হলে বাড়ির মেঝেসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ কেন?

খুনের সময় গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের সকলেই কি একে একে খুনী দুই কিশোরের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল? তখন তারা কি কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেননি বা বাঁচার জন্য চিৎকার করেননি? তাহলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতিবেশীরা কিছু শুনতে পেলেন না কেন? বাড়িতে চারটি লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পরও প্রতিবেশীরা কিভাবে বুঝতে পারলেন না?

পুলিশের তাৎক্ষণিক ভাষ্য অনুযায়ী রাতের কোনো এক সময়ে খুন সঙ্ঘটিত হয় এবং এরপর বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু আগামী চক্রবর্তীর বান্ধবীর সাথে ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের ফেসবুক চ্যাটিং অনুযায়ী জানা যায়, সারারাত ওই বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল অর্থাৎ ভোর পৌনে ৬টা পর্যন্ত তারা জীবিত ছিলেন বলে ইঙ্গিত মেলে। তাহলে প্রকৃত সময়কাল নিয়ে বিভ্রান্তি কেন?

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাড়ির সামনের মন্দিরে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ কোথায় গেল? অভিযুক্তরা জুমার নামাজের সময় রাস্তা ফাঁকা পেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি সংলগ্ন পুরো এলাকা হিন্দুধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত, যেখানে কোনো মসজিদ নেই এবং মুসল্লিদের চলাচলও নেই তাহলে এই বয়ান কিভাবে সঙ্গতিপূর্ণ?

ঘটনার কিছুদিন আগে আগামী চক্রবর্তী তার বান্ধবীর কাছে ফেসবুক মেসেঞ্জারে জানতে চেয়েছিলেন, থানায় জিডি বা এফআইআর করলে সরকারি চাকরিতে প্রভাব পড়বে কি-না। তিনি কেন থানা-পুলিশের আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন?

মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির নির্মাণকাজ নিয়ে চাঁদাবাজদের হুমকির মুখে ছিলেন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। তাহলে কারা তাকে চাঁদার জন্য হুমকি দিচ্ছিল, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে কি?

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়া গণপতি চক্রবর্তী খুনের কয়েক দিন আগে ব্যাংক থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকা তোলেন। সেই টাকা এখন কোথায়?

প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর লাশ বিবস্ত্র অবস্থায় উদ্ধার হয় এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় মুখমণ্ডল কালো ও বিকৃত ছিল। পোস্টমর্টেমে যুক্ত ডোম যতীন বাসফোরের ভাষ্যমতে, উভয়ের শরীরে স্পার্মের উপস্থিতি ছিল, কিন্তু রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক তথা ফরেনসিক কর্মকর্তা বাবুল কুমার বিশ্বাস বলছেন, ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি এবং মৃত্যুর দুই দিন পর এমন আলামত সংগ্রহের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সুরাহা কী?

সিআইডি ল্যাবে ডিএনএ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিপোর্ট আসতে ন্যূনতম ১৫-২০ দিন সময় লাগে বলে জানা যায়। তাহলে এত দ্রুত কিভাবে খুনি চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা হলো?

আসামি সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেফতারের সময় পরিবারের দাবি অনুযায়ী, তার পরনে গেঞ্জি ছিল, কিন্তু পরে ডিবি অফিসার সনাতন চক্রবর্তীর শার্ট তার পরনে দেখা যায়। এ বিষয়ে ডিবি কর্মকর্তার ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি; বরং নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

পুলিশের নতুন বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকজন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে লাশ টেনে সিঁড়ির দিকে নামাতে দেখেছেন। যদি তারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েই থাকে, তাহলে এরপর স্বাভাবিক আচরণ হওয়া উচিত ছিল দ্রুত পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু তারা যদি সত্যিই দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে থেকে থাকে, তাহলে কেন? তারা কি পালানোর সুযোগ পেয়েও পালায়নি? নাকি পুলিশের বর্ণিত ঘটনার সাথে বাস্তব ঘটনা পুরোপুরি মেলে না?

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ১৫ হাজার টাকার লুটে সিদ্ধার্থের ভাগ তিন হাজার ৫০০ টাকা হলো কিভাবে? পুলিশ বলছে, লুট হয়েছিল ১৫ হাজার টাকা। আবার বলা হয়েছে, সিদ্ধার্থ তার ভাগে পেয়েছিল তিন হাজার ৫০০ টাকা। যদি দু’জনের মধ্যে সমান ভাগ হয়, তাহলে প্রত্যেকের পাওয়ার কথা সাত হাজার ৫০০ টাকা। তাহলে তিন হাজার ৫০০ টাকা কিভাবে হলো? যদি টাকা চারজনের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে, তাহলে বাকি দু’জন কারা? এই হিসাব কি তদন্তকারীরা পরিষ্কার করেছেন?

ইয়াবার সংখ্যাই কেন বারবার বদলাচ্ছে? পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে বলা হয়েছিল, সীমান্তের বাড়িতে তিনটি ও পরে বন্ধক রেখে আরো চারটি— মোট সাতটি ইয়াবা সেবন করা হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে, ইয়াবার সংখ্যা নয়টি। সাত থেকে নয়— এই অতিরিক্ত দু’টি ইয়াবার হিসাব কোথা থেকে এলো? তদন্তে জব্দ করা ইয়াবার হিসাব, সেবনের হিসাব ও অভিযুক্তদের বক্তব্য— এসব কি পরস্পরের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছে?

কিন্তু প্রতিটি নতুন তত্ত্বের সাথে যদি নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে তদন্ত কি সত্যিই একটি নির্দিষ্ট ও প্রমাণভিত্তিক জায়গায় এগোচ্ছে? নাকি একটি তত্ত্ব দুর্বল হয়ে পড়লে আরেকটি তত্ত্ব সামনে এনে মূল প্রশ্নগুলোকে আড়াল করা হচ্ছে?

আরো বলা হয়, ঘটনার আগে-পরে অচেনা মোটরসাইকেলগুলোর ভূমিকা কী? ঘটনার রাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতির বাড়ির সামনে অচেনা মোটরসাইকেলের আনাগোনা ছিল বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন। সেগুলো কার ছিল? তারা কেন সেখানে এসেছিল? কেউ কি আগে থেকে বাড়িটি পর্যবেক্ষণ বা রেকি করছিল?

গ্রেফতার দুই আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলা হলেও, তা প্রলোভন, হুমকি বা প্রতিশ্রুতির প্রভাবমুক্তভাবে দেয়া হয়েছে কি-না, তা নিয়ে যথেষ্ট গুঞ্জন রয়েছে। উপরন্তু, গত ২৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন, যা আইনসম্মত নয় এবং তদন্ত ও ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। তার এই বক্তব্য আগের বক্তব্যের সাথেও সাংঘর্ষিক।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আসামির পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে মূল আলামত নষ্ট করা ও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যদি পুলিশি হেফাজতে থাকা বা তদন্তাধীন স্থান থেকে এভাবে আলামত গায়েব হয়ে যায়, তবে নিরপেক্ষ বিচার পাওয়া কিভাবে সম্ভব?

সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রশ্নের উত্তর দাবি করেন পলাশ কান্তি নাগ। এর মাধ্যমে ধোঁয়াশা দূর হবে বলেও মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর পুলিশের পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, আমাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ আদালতে দেয়া জবানবন্দি ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখন পর্যন্ত যা আমরা পেয়েছি সেটি ব্রিফ করেছি। তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই এখনো বলা যাচ্ছে না। তদন্ত আমরা ফুলস্টপ করিনি। সুতরাং সব প্রশ্নের উত্তর সমাধানের মাধ্যমে ঘটনাটি পরিষ্কার হবে। কিন্তু তার আগেই এভাবে জাজমেন্ট দেয়া হচ্ছে। তাতে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম কিছুটা হলেও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২২ আগস্ট ভোররাতে নগরীর মাছুয়াপাড়া নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম।

এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামের দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরই মধ্যে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পুলিশের হাতে পৌঁছেছে।