শাহ আলম নূর
দেশীয় গ্যাসের মজুদ ও উৎপাদন কমার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হয়েছে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা। এখন সে নির্ভরতার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জ্বালানি খাতকে। স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনতে গিয়ে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, অন্য দিকে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পরও শিল্পকারখানায় মিলছে না চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ। এমন পরিস্থিতিতে এক দিকে বাড়ছে জ্বালানি আমদানির বোঝা, অন্য দিকে গ্যাস সঙ্কটে কমছে শিল্প উৎপাদন। পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল ও ম্যানুফ্যাকচারিংসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে বিপুল আর্থিক ক্ষতি। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা ছাড়া এলএনজি দিয়ে ঘাটতি মেটানোর বর্তমান কৌশল দেশের অর্থনীতিতে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে। এতে এক দিকে ডলার যাচ্ছে জ্বালানি কিনতে, অন্য দিকে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে কমছে রফতানি ও বিনিয়োগের সক্ষমতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনেও মিলছে না নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস। এ দিকে উৎপাদন কমেছে পোশাক-টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল কারখানাগুলোতে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন খাতে দৈনিক ক্ষতি প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বলে ডিসিসিআই এর তথ্যে দেখা গেছে।
এ দিকে স্পট মার্কেট থেকে একের পর এক এলএনজি কিনছে সরকার; কিন্তু চড়াদামে আমদানি করা এ তরল গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার পরও শিল্পকারখানার দরজায় পৌঁছাচ্ছে না প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে মেশিন চালানো যাচ্ছে না, কোথাও দিনের বড় একটি সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। আবার উৎপাদন কমে যাওয়ায় সময়মতো রফতানি পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে বাড়ছে এয়ারফ্রেইট, ডিসকাউন্ট ও অর্ডার হারানোর ঝুঁঁকি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে পোশাক খাতের উৎপাদন সক্ষমতা এক পর্যায়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। জ্বালানি সঙ্কটের কারণে কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। শিল্পের স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এলএনজি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু সাময়িকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শিল্পের ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় বাড়াতে হবে।
এ দিকে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটে এক পর্যায়ে প্রায় ৬০০ টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা শুধু উৎপাদন কমাচ্ছে না; বরং শিল্পের বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। টেক্সটাইল খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে রফতানিমুখী শিল্পের ওপর চাপ আরো বাড়বে বলে তিনি মনে।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি সঙ্কট এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এলএনজি আমদানি করে সাময়িকভাবে ঘাটতি পূরণ করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
এ দিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) তথ্য বলছে, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে দেশের শিল্পখাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সমপরিমাণ উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। কারখানাগুলো যদি গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতায়ও চলে, তাতেও দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৭৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ দিকে গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে, তার দামও বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। সেপ্টেম্বরের জন্য অনুমোদিত কয়েকটি কার্গোর দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) প্রায় ২৯ থেকে ৩০ ডলারে উঠেছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের আগে বাংলাদেশ সাধারণত স্পট মার্কেট থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ ডলারে এলএনজি কিনত।
অর্থাৎ স্পট মার্কেটের এলএনজির দাম আগের তুলনায় প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। একটি প্রচলিত এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে। ফলে ৩০ ডলারের কাছাকাছি দরে একটি কার্গো কিনতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। শুধু ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলারের একটি কার্গোর হিসাবেই পণ্যমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে এর মূল্য প্রায় এক হাজার ২৩২ কোটি টাকা। অন্য কার্গোটির মূল্যও প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সঙ্কটের শুরুতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। জুলাইয়ের ২১ তারিখ মোহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এর আগে থেকেই দেশে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কমছিল এবং আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছিল। আগস্টে পরিস্থিতির চিত্র ছিল আরও স্পষ্ট। পেট্রোবাংলার হিসাবে, ওই মাসে গড়ে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছিল প্রায় দুই হাজার ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুটে, যেখানে সরকারি হিসাবে চাহিদা ছিল প্রায় তিন হাজার ৮৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি ছিল প্রায় এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। এক পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ আরো কমে যায়। আগস্টের মাঝামাঝি এক দিনে মোট সরবরাহ ছিল প্রায় দুই হাজার ২৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার ৫৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাসের তীব্র সঙ্কটে অনেক নিটওয়্যার কারখানা উৎপাদন সচল রাখতে সিএনজি ফিলিংস্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করছে; কিন্তু সেখানেও পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং উদ্যোক্তাদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, পোশাক কারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের চাপ কমে গেলে শুধু উৎপাদন কমে না, একই সাথে মেশিনের কার্যক্ষমতা কমে, উৎপাদন সময় বাড়ে এবং ইউনিটপ্রতি ব্যয় বেড়ে যায়। রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি মোকাবেলা করা হলেও সে গ্যাস শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী পৌঁছানো না গেলে আমদানির সুফল পাওয়া যাবে না। তাই এলএনজি আমদানির পাশাপাশি গ্যাস বিতরণ অবকাঠামো, পাইপলাইন ও শিল্পাঞ্চলের সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) একটি জরিপে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে ৭৮ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানায় উৎপাদন আংশিক বন্ধ রয়েছে। নিটিং, ডায়িং ও গার্মেন্টস সেলাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপে উৎপাদন ৩৭ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। একই সময়ে ৫৫ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল বা কমেছে।
অর্থাৎ গ্যাসের চাপ কমে গেলে ক্ষতি শুধু একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কাঁচামাল ঢোকার পর স্পিনিং, নিটিং, ডায়িং, ফিনিশিং থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি ও রফতানি-পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ছে। একটি ধাপে গ্যাস না থাকলে পরের ধাপেও উৎপাদন আটকে যাচ্ছে।
এ দিকে সিরামিক শিল্পে সঙ্কট আরো তীব্র। বিভিন্ন কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে আসার কথা জানিয়েছে। প্লাস্টিক শিল্পের অনেক কারখানাও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টিল, গ্লাস, সিমেন্ট, কাগজ, ডাইং, স্পিনিং, ফার্নেসনির্ভর কারখানা-সবখানেই গ্যাসের চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন উপাদান। প্রয়োজনীয় চাপ না থাকলে শুধু উৎপাদন কমে না, যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক দক্ষতায় চালানোও সম্ভব হয় না। ফলে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এ দিকে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল জেনারেটর চালানো হলে খরচ আরো বেড়ে যাচ্ছে।



