বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বিশেষ করে ১৬ জুলাই রংপুরে বুক পেতে দিয়ে পুলিশের গুলিতে সমন্বয়ক আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর সারা দেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। বিবেক জেগে ওঠে অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থকেরও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি ও ক্ষমতাসীনদের হামলায় সারা দেশে যখন রক্ত ঝরছিল, তখন বিটিভিসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পরিদর্শনে গিয়ে চোখের পানি ফেলতে থাকেন শেখ হাসিনা। ওই সময় তাকে অনুসরণ করেন সংসদে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা জাপা প্রধান বেগম রওশন এরশাদ। ২৭ জুলাই ক্ষতিগ্রস্ত সেতু ভবন, স্বাস্থ্য অধিদফতর, মিরপুর ১০নং ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শন গিয়ে জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান রওশন বলেন, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার নিন্দা জানানোর ভাষাও আমি হারিয়ে ফেলেছি। যারা দেশের এতবড় ক্ষতি করেছে- তাদের রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে বিচার করা হোক। কোনো দেশের নাগরিক তার দেশের সম্পদ এভাবে ধংস করতে পারে না। যারা করেছে তারা দেশের শত্রু। জাপার (রওশন) মহাসচিব কাজী মামুনুর রশীদ, কো-চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম সেন্টু, সুনীল শুভ রায়সহ কেন্দ্রীয় নেতাও ছিলেন রওশন এরশাদের সাথে। রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, এভাবেই বিগত সাড়ে ১৫ বছর শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জাতীয় পার্টি ছিল সহযোগীর ভূমিকায়। এর মধ্যে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচন বিনাভোটে, দিনের ভোট রাতে কিংবা বিরোধী মতকে দমন করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে আওয়ামী লীগ, যার সহযোগী ছিল জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের সমর্থনে ২০০৯ সালে ৯ম সংসদে সরকার গঠনের পর দেশে স্বৈরতন্ত্রের বীজবপন করেন শেখ হাসিনা। ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলকে ভোটের বাইরে রেখে স্বৈরশাসনের সূত্রপাত করেন তিনি। এভাবেই স্বৈরশাসন চলে আরো ১০ বছর। গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসিনার স্বৈরশাসনে প্রধান সহযোগী ছিল জাতীয় পার্টি।
যেভাবে শুরু : সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। ওই সময়ের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি-জামায়াত জোটসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই সে নির্বাচন বয়কট করে। কিন্তু নানা নাটকীয়তায় কথিত ওই নির্বাচনে অংশ নেয় হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। দলের চেয়ারম্যান এরশাদ নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে ঘোষণা দেয়ার পর বিশেষ সংস্থা দিয়ে তাকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে দলীয় সূত্র জানায়। তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে বিতর্কিত এ নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি।
রাজনৈতিক মহল বলছেন, প্রতিবেশী একটি দেশের ছত্রছায়ায় অনুষ্ঠিত বিএনপি-জামায়াতবিহীন এ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই ছিল না, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের এমপি ঘোষণা করা হয়। বিনাভোটের বিতর্কিত এ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধীদলীয় নেতা হন রওশন এরশাদ। এরশাদকে করা হয় মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পান জাপার তিনজন নেতা। একই সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের আসনে বসে নানা সমালোচনার জন্ম দেয় জাতীয় পার্টি, যা দলের মধ্যেও সমালোচনার জন্ম দেয়। গৃহপালিত বিরোধী দলের তকমা পায় জাপা। এরশাদকে মাইনাস করে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপার প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশিদ, আবু হোসেন বাবলা, মুজিবুল হক চুন্নু, সাবেক মহাসচিব মরহুম জিয়াউদ্দিন বাবলু, মসিউর রহমান রাঙা, গোলাম মসিহ প্রমুখ ছিলেন স্বৈরাচারের সহযোগী ও সুবিধাভোগী। ২০১৪ নির্বাচনে জাপার ৩৪ জনকে এমপি বানানো হয়। তাদের মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয় কয়েকজনকে।
২০১৮ সালে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে দেয়া নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। বিএনপি-জামায়াত জোট এই নির্বাচনে অংশ নিলেও সাজানো নির্বাচনে ভরাডুবি হয় তাদের। বিএনপি মাত্র ৭টি আসন পায়। আর এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির এমপি হন ২২ জন। এরশাদ বিরোধী দলীয় নেতা আর তার ভাই জি এম কাদের হন উপনেতা। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে এমপি হন ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম বিতর্কিত সেনাকর্মকর্তা লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তার দলের মধ্যেই সমালোচনা আছে মূলত তিনি আওয়ামী কোটায় ফেনী-৩ আসন থেকে জাতীয় পার্টির এমপি হন। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি অংশ নেয়। আসন পায় মাত্র ১১টি। এ তালিকাতেও এমপি ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তাকে করা হয় জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতার আসনে ছিলেন জি এম কাদের। সংসদে উপনেতা হন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
তবে এই নির্বাচনে জি এম কাদেরের কৌশলে রাজনীতি থেকেই ছিটকে পড়েন রওশন এরশাদ ও তার ছেলে সাদ এরশাদ। আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতার কোটার বাইরে নির্বাচন করে এমপি হতে পারেননি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমানসহ আগের বারের ১৪ এমপি। নির্বাচন করেননি রওশন এরশাদ, সাদ এরশাদ ও কাজী ফিরোজ রশিদ। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে হেরে যান মসিউর রহমান রাঙা। স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টির এমপি হয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা বাণিজ্য করেন অনেক নেতা। তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বিদ্যুৎ খাত এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জনশক্তি রফতানি খাতে শত শত কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক মহল বলছেন, শেখ হাসিনার স্বৈরাচার হওয়ার পেছনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন বয়কট করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু কৌশলে প্রতিবেশী একটি দেশের সমঝোতায় জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে ওই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করে তোলে আওয়ামী লীগ। জি এম কাদেরের এই নির্বাচনে ভূমিকা না থাকলেও দলটির অন্য শীর্ষনেতারা স্বৈরাচারের দোসর হয়ে উঠেন।
সঙ্কটে জাতীয় পার্টি : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক কিশোরসহ দু’জনকে হত্যার পৃথক মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকেও আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে একটিতে জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরীফা কাদেরও আসামি। অন্য দিকে গত ৫ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংস্কার ইস্যুতে অন্তর্বর্তকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সংলাপে বসলেও সেখানে ডাক পায়নি জাতীয় পার্টি। সংলাপের দুই দিন আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজ নিজ ফেসবুক পেজে জাতীয় পার্টি নিয়ে পোস্ট দেন। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সহযোগী ছিল জাপা। একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃৃত্বের পক্ষ থেকে দলটির ব্যাপারে আপত্তি দেয়ার কারণে ওই সংলাপে ডাকা হয়নি তাদের। সূত্র আরো জানায়, আগামী ১৯ অক্টোবর বাকি দলগুলোর সাথে সংলাপে বসতে পারেন ড. ইউনূস। সে দিনের সংলাপের জন্য ড. অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি, আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিসহ আরো কয়েকটি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটকে সংলাপে ডাকা হবে না। এমনকি আওয়ামী লীগের মিত্র বা দোসর হিসেবে পরিচিতি কোনো দলের সাথেও অন্তর্বর্তী সরকার আলোচনায় বসবে না। এটি সরকারের নীতিগত অবস্থান বলে সূত্রগুলো বলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে মিত্র বা সহযোগীর তকমা পাওয়া জাতীয় পার্টির নেতারা কখনো মন্ত্রিত্ব নিয়ে সরকারের অংশীদার হয়েছেন। কখনো সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে ‘গৃহপালিত’ উপাধিও পেয়েছেন। তবে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে বলেছেন, আমরা কোনো সময় তাদের (আওয়ামী লীগ) দোসর হিসেবে কাজ করিনি। আমরা সব সময় জনগণের দোসর হিসেবে কাজ করেছি। আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা আমরা কখনোই করিনি; যতটুকু দেখানো হয়েছে, সেটা গায়ের জোরে করানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, জাতীয় পার্টিকে বাঁচাতে তাদের বাধ্য হয়ে বিভিন্ন ভূমিকা নিতে হয়েছিল। এ দিকে, জি এম কাদেরসহ জাতীয় পার্টির নেতাদের নামে হত্যা মামলা প্রত্যাহারে সম্প্রতি রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয় পার্টি।



