স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের দোসর হিসেবে আন্দোলনের মুখে মহাপরিচালক (ডিজি) পদ থেকে সরানো হয় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) ড. আব্দুল আউয়ালকে। তাকে সরিয়ে চারজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ড. নার্গীস আক্তারকে।
গত ২০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতন হলেও এখনো স্বৈরাচারের দোসরদের হাতেই রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরই)। এখনো বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তারা চাপের মুখে রয়েছেন। বিজেআরআই-এর নাটাই এখনো স্বৈরাচারের সহযোগীদের হাতে। সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখনো বিগত দিনের সুবিধাভোগীরাই বসে আছেন।
গত বছরের ২৩ জানুয়ারি মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের (সিএসও) হালনাগাদ জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করে বিজেআরআই। তখনকার পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) ড. এস এম মাহবুব আলী স্বাক্ষরিত সিএসও পদের (তৃতীয় গ্রেড) ১২ জনের গ্রেডেশন তালিকায় ড. নার্গীস আক্তারের নাম রয়েছে ৫ নম্বরে। কিন্তু, গ্রেডেশন তালিকার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে তাকে পরিচালক (কৃষি) পদে পদায়ন করে বিগত সরকার। এ তালিকা থেকে গ্রেডেশনের ২ নম্বর সিরিয়ালে থাকা সিএসও ড. আ: আলীম ও ৪ নম্বরে থাকা ড. মো: মাসরুর আনোয়ারকে বাদ দেয়া হয়। পরিচালকের বাকি তিনটি পদে বসানো হয় গ্রেডেশন সিরিয়ালের ১ নম্বরে থাকা মো: মোসলেম উদ্দিন, ৩ নম্বর সিরিয়ালের ড. ফেরদৌস আরা দিলরুবা ও ৭ নম্বরের ড. মাহমুদ আল হোসেনকে। এর মধ্যে মাহমুদ আল হোসেন পটুয়াখালী কৃষি কলেজের (বর্তমান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। অন্যরাও আওয়ামী সমর্থক হিসেবে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক তাদের পরিচালক পদে পদায়ন করেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিএআরসির তৎকালীন সদস্য পরিচালক ড. আব্দুল আউয়ালকে দলীয় বিজেআরআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) নিযুক্ত করেন সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। বাকৃবির সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল আউয়াল ডিজি নিযুক্ত হওয়ার পর বিজেআরআইকে নিজ দলীয়দের পুনর্বাসন করেন। বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগ পন্থীদের ভালো জায়গায় পদায়ন দেন। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিয়োগবাণিজ্যসহ নানা খাতে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আব্দুল আউয়ালেরই পছন্দের তালিকায় থাকা ড. নার্গীস আক্তারকে ডিজি হিসেবে রুটিন দায়িত্ব দিয়েছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ নিয়ে বিজেআরআইতে প্রতিক্রিয়া চলছে অনেক দিন ধরেই।

বিজেআরআই সূত্রে জানা যায়, আব্দুল আউয়ালের সময় তিনজন তৃতীয় গ্রেডের (সিএসও) কর্মকর্তাকে পরিচালকের চলতি দায়িত্ব দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এই তিনজনের দুইজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে করা হয়। এর মধ্যে নার্গীস আক্তারকে পরিচালক করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্য মিল্ক ভিটার তখনকার চেয়ারম্যান শেখ নাদিম হোসেন লিপু। এক চিঠিতে তিনি গ্রেডেশনে দুই নম্বরে থাকা মো: আব্দুল আলীমকে বাকৃবির ছাত্রদলের সাবেক নেতা হিসেবে উল্লেখ করে তাকে বিজেআরআই-এর পরিচালক পদে নিয়োগ না দিতে অনুরোধ করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আব্দুল আলীমকে বাদ দিয়ে ফরিদপুরের মেয়ে ড. নার্গীস আক্তারকে পরিচালক করতে এমন চিঠিতে স্বাক্ষর নেন নার্গীস আক্তারের স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা একই সময় মিল্ক ভিটার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ছিলেন।
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে পতন হয়েছে স্বৈরশাসকের। বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে কৃষি মন্ত্রণালয় ড. আউয়ালকে বিজেআরআই-এর মহাপরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে বিএআরসিতে সংযুক্ত করেছে। কিন্তু তার পদে যাকে রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তিনি আউয়ালেরই অনুসারী বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তার স্বামীর প্রভাবেই গ্রেডেশনে পেছনে থেকেও পরিচালক করা হয় ড. নার্গীস আক্তারকে। আবার গ্রেডেশনে শীর্ষ দুইয়ে থাকা বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলীমকে বাদ দিয়ে নার্গীসকেই আবার ডিজির রুটিন দায়িত্ব দেয়ায় বিজেআরআইতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিজেআরআই সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটিতে তিনটি পরিচালকের পদে (দ্বিতীয় গ্রেড) কৃষি মন্ত্রণালয় নিয়োগ দিয়ে থাকে। আরেকটি পদ (পরিচালক, প্রশাসন ও অর্থ) ডিজির হাতে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার মাধ্যমে ডিজির দায়িত্ব পাইয়ে দিতে লবিং করেন পিএসও তথা চতুর্থ গ্রেডের এক কর্মকর্তা। বিনিময়ে তিনি পরিচালক, প্রশাসন ও অর্থ পদটি পেতে শর্ত দেন।
বিজেআরআই এর বৈষম্যবিরোধী কমিটির সভাপতি কৃষিতত্ত্ব বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিএসও) ড. মো: আব্দুল আলীম। তিনি বলেন, শুধু সিনিয়রকে ডিঙিয়ে ডিজি করা হয়নি। বিগত সরকারের সময়ের ডিজি ড. আব্দুল আউয়াল বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে দূরে দূরে বদলি করে গিয়েছিলেন। তারা এখনো সেখানেই রয়েছেন। যে কয়জনকে আনা হয়েছে, তারা ওদেরই লোক।

ডিজির প্রতি মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার অনাস্থা, চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন :
এদিকে, বিজেআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোছা: আলেয়া নাসরীন গবেষণা কাজে ডিজি সহযোগিতা করছেন না- এমন অভিযোগ এনে চাকরি থেকেই অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনে তিনি ডিজিকে লেখেন, ‘গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আমি অফিস করি। আমি মাইক্রোবায়োলজি শাখা ও বায়োকেমিস্ট্রি শাখার গবেষণাগার অনেক শ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছি। আমি আমার চাকরির শেষ দিন পর্যন্ত এই গবেষণাগারে গবেষণা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি বেশ বুঝতে পারছি আপনি আমাকে গবেষণা করতে দিবেন না। আপনি গবেষণা, গবেষণাগার এবং গবেষণার যন্ত্রপাতি বিষয়ে আন্তরিক নন এবং সত্যিকার অর্থে আপনার কাছে এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। গবেষণার চাকরিতে থেকে গবেষণা না করতে পারলে আমার কাছে চাকরি করা অর্থহীন। আপনার অধীনে অফিসের কোনো গবেষণা হবে না। আপনি যেহেতু আমাকে গবেষণা করতে দিবেন না এবং আপনার অধীনে থেকে আমি কোনো গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবো না তাই আমি চাকরি থেকে অব্যাহতি চাচ্ছি। অতএব, অনুগ্রহ করে আমাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে বাধিত করবেন।’
বিষয়টি স্বীকার করে ড. মোছা: আলেয়া নাসরীন গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, বিষয়টি কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদেরও জানিয়েছি। গবেষণা করতে না পারলে চাকরি করে লাভ কী?
এ বিষয়ে কথা বলতে ডিজি ড. নার্গীস আক্তারকে ফোন দিলে তিনি জানান, আবেদনটি প্রপার ওয়েতে করেনি। এটা এখনো আমার কাছে আসেনি। সিনিয়রদের ডিঙিয়ে তাকে মহাপরিচালক নিয়োগসহ অন্যান্য বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) সচিব মহোদয় আসবেন। এটা নিয়ে ব্যস্ত আছেন।
গ্রেডেশনের ৫ নম্বরে থাকা ড. নার্গীসকে ডিজি করা প্রসঙ্গে কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, বাস্তবতা বুঝতে হবে। আপনি ওখানে যান, দেখেন ওই পাঁচজনের মধ্যে কে যোগ্য। আমি তাদের সাথে কথা বলে যাকে প্রতিষ্ঠান চালাতে যোগ্য মনে করেছি, সবার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে এটা করেছি।