২২ মাসে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানো প্রায় পৌনে ৫ লাখ শ্রমিকের কেউ এখন আর বেকার নেই। তাদের বেশির ভাগই কাজ করে দেশে কোটি কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। দেশ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের প্রতিটি পরিবারও হচ্ছে সচ্ছল।
তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে মালয়েশিয়ায় গিয়ে শুরুর দিকে কিছু শ্রমিকের সমস্যা হলেও পরবর্তীতে তাদের সমস্যা চিহ্নিত করে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে সমাধান করা হয়। যদিও মালয়েশিয়া সরকারের মনোনীত বেস্টিনেট কোম্পানির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ অনলাইন পদ্ধতিতে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে কোনো শ্রমিকদের বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে মালয়েশিয়ায় ভিসা ক্রয় করতে গিয়ে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন বলে জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বায়রার নেতাদের কাছ থেকে জানা গেছে।

ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী, বায়রার সাবেক মহাসচিব ও মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অন্যতম উদ্যোক্তাদের একজন রুহুল আমিন স্বপন। তিনি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলা এবং সেখানে যাওয়ার পর কর্মীদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে টেলিফোনে নয়া দিগন্তকে বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের ইচ্ছাতেই গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে এমওইউ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সম্পূর্ণ অনলাইন পদ্ধতিতে ২২ মাসে (বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত) পৌনে ৫ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। পাড়ি জমানো এসব শ্রমিকদের কেউ আর এখন বেকার নেই। কারণ সেখানে কাজের প্রচুর চাহিদা। কিন্তু কর্মীর সঙ্কট। যারা গেছেন তাদের প্রত্যেকেই মাসে ১৫০০ রিংগিট বেতনের পাশাপাশি ওভারটাইম পাচ্ছেন। সবমিলিয়ে বাংলাদেশী টাকায় ৫০ হাজার টাকার মতো উপার্জন করতে পারছেন একেকজন। সেই হিসাবে প্রতি মাসে মালয়েশিয়া থেকে গড়ে ২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আসছে। বছরের হিসাব করলে ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শুধু এই শ্রমবাজার থেকে আসছে বলে জানান এই শ্রমবাজারের অন্যতম উদ্যোক্তা।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার পর আমাদের শ্রমিকরা ভালোই আছেন। শুরুর দিকে কিছু কর্মীর কাজের সমস্যা হয়েছিল। সেগুলো সমাধান করে দিয়েছেন আমাদের হাইকমিশনের কর্মকর্তারা। উপরন্তু মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে চুক্তি অনুযায়ী কর্মীদের সব প্রকার অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে দেশে রেমিট্যান্স আসার হার অনেক বেড়েছে। শুধু ২০২৪ সালের আগস্ট মাসেই মালয়েশিয়া থেকে ২৫১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এতগুলো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পরও সরকার বা আমাদের সদস্যদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন তো পাইনি, উল্টো আমাদেরকে কিভাবে সমাজে নাজেহাল করা যায় সেই চেষ্টাই করা হচ্ছে। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে রুহুল আমিন স্বপন বলেন, আমার প্রতিষ্ঠান ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ বিনাখরচে (জিরো কষ্ট মাইগ্রেশন) ৩৮৫ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নিয়োগকারী কোম্পানি সব অভিবাসন ব্যয় বহন করেছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় পৌনে ৫ লাখ কর্মী যাওয়ার কারণে দেশে থাকা তাদের ২০ লাখ পরিবারের সদস্যও উপকৃত হয়েছেন। স্বপন আরো বলেন, মালয়েশিয়া সরকার ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দিলেও জনশক্তি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগী এজেন্সি এবং নিয়োগকারীর পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মারফত ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে আরো প্রায় ১১০০ রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজ করেছেন। এ ক্ষেত্রে কর্মীদের পাশাপাশি তারা নিজেরাও সচ্ছল হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ‘বিদেশের শ্রমবাজার নিয়ে আমাদের দেশের কিছু গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা বেশি হওয়ায় নিয়োগকারী দেশগুলোতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে। তার মতে, মালয়েশিয়া সরকারের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে দেশটির প্লানটেশন ও কৃষি খাতে শ্রমিকের চাহিদা পূরণের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে।

স্বপন বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ইমেজ কাজে লাগিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারসহ বিশ্বের যেসব শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে সেগুলো আবারো খুলবে। এ ক্ষেত্রে শুধু সরকারই সবকিছু করে দেবে তা কিন্তু নয়, আমাদের সব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদেরও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কমাতে হবে অভিবাসন ব্যয়। এ ক্ষেত্রে আসন্ন বায়রা নির্বাচনে সঠিক নেতা নির্বাচন করতে হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।