স্বামী মহাপরিচালক (ডিজি)। একই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র পরিচালক তার স্ত্রী। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির পাঁচজন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিএসও) বা তৃতীয় গ্রেডের পদ রয়েছে। তার মধ্যে আছেন দু’জন; তারাও এই স্বামী-স্ত্রী। আলোচিত এই প্রতিষ্ঠানটির নাম বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। বিগত তিন বছর ধরে স্বামী-স্ত্রীর কব্জায় রয়েছে বিএলআরআই। অনেকে আবার একটু মজা করে বলে থাকেন ‘রাজা-রানীর শাসন চলছে বিএলআরআইতে’। তাদের মর্জি মতো চলছে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। তবে, আগের মতোই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ম্যানেজ করে চলছেন ডিজি। স্বৈরাচারের সহযোগী হলেও এখনো বহাল রয়েছেন তিনি।

২০২১ সালের নভেম্বরে পতিত স্বৈরাচারের সময় বিএলআরআই-এর ডিজি হিসেবে নিয়োগ পান ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। ডিজি নিয়োগের পর তার স্ত্রী ড. নাসরিন সুলতানা পান পরিচালকের (গবেষণা) রুটিন দায়িত্ব। গত ৫ আগস্ট স্বৈরশাসনের পতন হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার তিন মাস শেষ হওয়ার পথে; কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে আছেন নিয়োগবাণিজ্যসহ অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া দলবাজ ডিজি জাহাঙ্গীর হোসেন। শেখ হাসিনার পতনের পর চেষ্টা করছেন নিরপেক্ষ সাজার। সহকর্মীদের গর্ব করে বলে বেড়াচ্ছেন, আমি যদি ডিজি না থাকি, সমস্যা কী? কোনো কারণে আমাকে সরিয়ে দেয়া হলে আমার স্ত্রী (ড. নাসরিন সুলতানা) হবে পরবর্তী ডিজি। ডিজির পদ তো ঘরেই থাকবে।

নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, শেখ হাসিনা যেমন একা একা স্বৈরাচার হয়ে উঠতে পারেননি তেমনি জাহাঙ্গীরের ক্ষেত্রেও তাই। বড় সহযোগী হিসেবে পেয়েছেন স্ত্রী নাসরিন সুলতানাকে। সহযোগী হিসেবে নিয়েছেন পিএসও (প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার) ড. বিপ্লব কুমার রায় ও জিল্লুর রহমানকে। তারা দু’জনই ডিজির বিশ্বস্ত কর্মকর্তা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিএলআরআই-এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার অদূরে সাভারে। প্রাণিসম্পদের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন বিএলআরআই-এর মূল্য লক্ষ্য। গত এক দশকে প্রাণিসম্পদ গবেষণার প্রধান এই প্রতিষ্ঠানটি এ অভিলক্ষ্য অর্জনে কাক্সিক্ষত সাফল্য পায়নি। গবেষণার চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা দলীয়করণ, টেন্ডার ও কেনাকাটাতেই বেশি মনোযোগ দেন।

জানা যায়, ২০২১ সালের নভেম্বরে বিএলআরআই-এর মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে নিয়োগ পান ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। তার স্ত্রী ড. নাসরিন সুলতানাকে করা হয় বাঘাবাড়ি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। কিছুদিনের মধ্যেই পরিচালকের (গবেষণা) রুটিন দায়িত্ব দিয়ে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয় তাকে। মূল পদ বাঘাবাড়ি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হলেও সাভারেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় তাকে। মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার পদ পাঁচটি। এর মধ্যে তিনটিই শূন্য। দু’জন আছেন, তারা এই স্বামী-স্ত্রী। শূন্য পদ পূরণে অন্য কর্মকর্তারা শর্ত পূরণ করলেও পদোন্নতির উদ্যোগ নেই। পরিচালকের তিনটি পদ, এর দু’টি পদই শূন্য। বিএলআরআইতে একটা কথার প্রচলন আছে, ‘ডিজি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চান না’।

গবেষণায় স্থবিরতা : জানা যায়, বিএলআরআই-এর গবেষণালব্ধ ৯৩টি প্রযুক্তি ও প্যাকেজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিন-চারটি (পিপিআর ভ্যাকসিন, গোল পক্স ভ্যাকসিন, নেপিয়ার ঘাস) ছাড়া বাকিগুলোর কোনোটাই খামারিদের কাছে জনপ্রিয়তা পায়নি। এর মধ্যে নেপিয়ার ঘাস, এটাও আবার বিদেশ থেকে আমদানি করা। মুন্সিগঞ্জ ক্যাটেল, রেড চিটাগাং ক্যাটেল (আরসিসি) দেশীয় জাত। এসব জাত উন্নয়নে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে বিএলআরআই। এর মধ্যে আরসিসি বা রেড চিটাগাং ক্যাটল প্রকল্পের পিডি ছিলেন বর্তমান মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন। দাবি করা হয়, এই প্রকল্পের আওতায় জাত উন্নয়নের মাধ্যমে গাভীর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা এক কেজি থেকে ছয় কেজিতে উন্নীত করেছেন; কিন্তু আরসিসি জাতের এই গাভী কৃষকের কাছে নেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কী কী গবেষণা করা হবে, গত জুনের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা সম্পন্ন হওয়ার কথা; কিন্তু নতুন অর্থবছর চলে যাওয়ার তিন মাস পরও সেটি চূড়ান্ত করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। আগের বছরগুলোতেও এভাবে চলে এসেছে। নিজেদের পছন্দ মতো বিজ্ঞানীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করার অভিযোগও রয়েছে ডিজি ও তার স্ত্রী ড. নাসরিন সুলতানার (পরিচালক-গবেষণা) বিরুদ্ধে। নাসরিন সুলতানার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ, এনএটিপি প্রকল্প থেকে একটি ওয়েব সাইট বানাতে পাঁচ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন; কিন্তু এখনো ওই ওয়েব সাইট আলোর মুখ দেখেনি।

ডিজি হওয়ার আগেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়েছিলেন জাহাঙ্গীর : ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ডিজি হওয়ার আগে আরসিসি বা রেড চিটাগাং ক্যাটেল উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্পের পিডি ছিলেন। তার পিডি নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আবেদন করেন। অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেন তৎকালীন সিএসও ড. মো: গিয়াস উদ্দিন। এর মধ্যে ১০টি গাভী ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত গিয়ে সংশ্লিষ্টরা দেখেন, ১০টির মধ্যে চারটি গাভী দুধ দিচ্ছে। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একটি গাভী চার লিটারের বেশি দুধ দেয়ার কথা থাকলেও এসব গাভী পৌনে দুই লিটার থেকে দুই লিটার করে দিচ্ছে। সবগুলো গাভীই আবার বয়স্ক।
জাহাঙ্গীর হোসেন তার প্রকল্প থেকে তিন নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে বিভিন্ন সময়ে যথাক্রমে ১৭.২৪ লাখ, ৭.৩৬ লাখ এবং ১৩.৬১ লাখ টাকা উন্মুক্ত চেক দিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। বিপুল পরিমাণ টাকা উন্মুক্ত চেকের মাধ্যমে উত্তোলন বিধিবহির্ভূত বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় অতিরিক্ত দাম দিয়ে স্বাস্থ্যহীন আরসিসি জাতের গাভী ক্রয়ের প্রমাণ পায় তারা।

এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কোরির অভিযোগও তদন্ত করেন সংশ্লিষ্টরা। বিএলআরআই-এর নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লজ্জায় চাকরি ছাড়তেও পারেন না আবার ঠিকমতো অফিসও করতে পারেন না- এমন অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এটা আগের অভিযোগের মতোই। এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার একই মন্তব্য।
ছাত্রলীগ নিয়োগ, বাণিজ্যে মনোযোগ : ইফতেখার আলম এলিন। ছিলেন ছাত্রলীগের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের (বাকৃবি) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ২০২৩ সালে দলীয় কোটায় বিএলআরআই-এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরও তিনি সরাসরি আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত। পতিত স্বৈরাচারের পতনের আগ পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন মাঠে। শুধু এলিন নন, এনাম আহম্মেদ, মিজানুর রহমান, ইশতিয়াক আহম্মেদ পিহান, আহনাফ আনজুম দারা, ইফতেখার আলম সরকারসহ অসংখ্য ছাত্রলীগের পদধারী নেতাকে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিএলআরআইতে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান ছিল তাদের। ডিজি জাহাঙ্গীরের মতো তারাও এখনো বহাল পছন্দ সই জায়গায়।

শুধু যে দলীয় কোটায় চাকরি হয়েছে তা নয়। ডিজি নিয়োগের পর ২০২২ সালে প্রথম বিএলআরআইতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ ২২ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, এই নিয়োগে চার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এক চাকরিপ্রার্থী ও কর্মকর্তার কথোপকথনের অডিও তখন ভাইরাল হয়, যা নিয়ে তখন দৈনিক নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। যেখানে চাকরি নিশ্চিতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার জন্য ২০ লাখ টাকা দাবি করেন ওই নারী কর্মকর্তা। ২০২৩ সালেও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদে ৪০ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। দল বিবেচনায় এবং অর্থের বিনিময়ে এসব নিয়োগ সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে ডিজি ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে কয়েক দিন বারবার ফোন দেয়া হলেও রিসিভ করেননি। এরপর নয়া দিগন্ত পরিচয়ে এই প্রতিবেদকের মোবাইল থেকে এসএমএস দেয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে তার স্ত্রী (পরিচালক-গবেষণা) ড. নাসরিন সুলতানা বলেন, আমার স্বামী ডিজি, এটাই একমাত্র অপরাধ। নিয়ম অনুযায়ী তার পরে বিএলআরআই-এর আমিই ডিজি হবো। তাই একটি মহল আমার বিরুদ্ধে নানাভাবে অপ্রচার চালাচ্ছে। নিয়োগ বাণিজ্য ও অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি বিএলআরআইতে কোনো নিয়োগ কমিটিতে নেই। তাই নিয়োগবাণিজ্যের সাথেও জড়িত থাকার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ও সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দারকে ফোনে পাওয়া যায়নি।