- খামারবাড়িতে কর্মকর্তাদের মধ্যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা
- মাঠে নজরদারি কম, উৎপাদন ব্যাহতের শঙ্কা
- সামাল দিতে রাতেও অফিস করছেন সচিব
স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে তিন মাসের বেশি হলো। কিন্তু এখনো কৃষি খাতের শৃঙ্খলা সেভাবে ফিরেনি। বিশেষ করে কৃষির প্রাণ খামারবাড়িতে অস্থিরতা বিরাজ করছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিগত তিন মাসে ১০টি সংস্থা/দফতর প্রধান নতুন নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (বিজেআরআই) বিভিন্ন দফতর/সংস্থায় এখনো পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরেনি। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী-দলবাজরা এখনো কাঠি নাড়ছেন। ডিএইর সদর দফতর খামারবাড়িতে বিএনপিপন্থীরা চালকের আসনে থাকলেও শুরু থেকেই বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যা চেষ্টার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কমপক্ষে ৭৬ জন কৃষি কর্মকর্তাকে জড়ানো হয়েছে। পরপর দু’টি আকস্মিক বন্যায় ৩৫টি জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও মাঠে জোরালো নজরদারি নেই খামারবাড়ি সংশ্লিষ্টদের। আসন্ন বোরো মৌসুম শুরুর দ্বারপ্রান্তে হলেও মাঠ কর্মকর্তাদের তদারকি ঢিমেতালে চলছে। প্রকল্পের পিডিসহ বিভিন্ন পদে নিজেদের অনুসারীদের বসাতেই ব্যতিব্যস্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, খাামারবাড়িসহ বিভিন্ন সংস্থা/দফতরের শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ৯টা, ১০টা পর্যন্ত অফিস করছেন কৃষি সচিব ড. মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। সামাল দিতে কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর বৈঠক করে ঘাম ঝরাচ্ছেন তিনি।
গণহারে কৃষি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা : ১৯ জুলাই, শুক্রবার। রাজধানী জুড়ে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার প্রতিবাদের ঢেউ। সেদিন বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করে। বহু মানুষ হতাহত হন। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ছিল অন্যতম হটস্পট। ওই দিনের ঘটনায় পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাসহ ২৬৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরো ১০০-১৫০ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা করেছেন মো: মিস্টার হোসেন নামে এক ব্যক্তি। মামলার এজাহারে তার বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে মোহাম্মদপুরে বসবাস করেন।
মামলার এজাহারে বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখা গেছে। বাদি তার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, তিনি পড়ালেখা জানেন না। কিন্তু কর্মকর্তাদের অফিসিয়াল নাম নির্ভুলভাবে আইডি নম্বরসহ ঠিকই উল্লেখ করা হয়েছে সুচারুভাবে। অভিযোগ রয়েছে, খামারবাড়ির কিছু কর্মকর্তা পদ দখলের জন্য এসব নাম সরবরাহ করেছেন। ১৯ জুলাই শুক্রবার ছিল। সরকারি অফিস সেদিন বন্ধ থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কর্মকর্তাদের এই মামলায় আসামি করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মামলার এজাহারে বাদি মিস্টার হোসেন উল্লেখ করেন, গত ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে রাস্তার ওপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে আসামিরা হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ করে। এ সময় আমার ছেলে গাড়িচালক মো: ইনছান আলী (২৬) আহত হয়। আসামিদের নাম সংগ্রহ এবং সার্বিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় মামলা করতে দেরি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে বাদি মিস্টার হোসেনের এজাহারে থাকা মোবাইল নম্বরে গতকাল বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও বন্ধ পাওয়া যায়। মোহাম্মদপুরের এই মামলায় আসামি করা হয়েছে অন্তত ৭৬ জন কৃষি কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের বেশির ভাগ আবার খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) সাবেক মহাপরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক এবং প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের অনেকেই আবার বিএনপি-জামায়াত অনুসারী। বিগত দিনে খামারবাড়িতে আওয়ামী রাজনীতি করা কর্মচারী নেতাদের এই মামলায় নাম না থাকলেও নাম রয়েছে বিএনপি-জামায়াতপন্থী হিসেবে আগের সরকারের সময়ে বঞ্চিত প্রধান সহকারী শাহাদাত হোসেনের।
খামারবাড়ি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএইর প্রায় দুই ডজন পিডিকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। যাদের বেশির ভাগই আওয়ামী মনোভাবের। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রকল্প পার্টনারের পিডির নাম নেই তালিকায়। অভিযোগ উঠেছে, অনেকের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে মামলার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
খামারবাড়ি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে গত ৪ আগস্ট সরকার পতনের ঠিক আগের দিন খামারবাড়ি এলাকায় কৃষিবিদদের কথিত শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসতে বাধ্য করা হয়। সাবেক কৃষিমন্ত্রী আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিমের নেতৃত্বে এই কর্মসূচি পালিত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব ওয়াহিদা আক্তারের নির্দেশনায় কৃষিবিদ সরকারি কর্মকর্তারা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। এই কর্মসূচিতে বিএআরসির তখনকার নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার, ডিএইর তখনকার ডিজি বাদল চন্দ্র বিশ^াস, সাবেক ডিজি হামিদুর রহমান, ডিএইর তখনকার পরিচালক (প্রশাসন) জয়নাল আবেদীন, তখনকার এআইএসের পরিচালক ড. সুরজিত সাহা রায়সহ আওয়ামীপন্থী বেশ কিছু কর্মকর্তা এই কর্মসূচি পালনে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। মাঠের কর্মকর্তাদের এতে অংশ নিতে বাধ্য করেন। মোহাম্মদপুর থানা দায়েরকৃত হত্যাচেষ্টা মামলায় তাদের পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং আওয়ামী লীগের নেতা ও ব্যবসায়ীদেরও কেউ কেউ আসামি হয়েছেন।
অনেকে বলছেন, মামলা হলে ৪ আগস্টের ঘটনায় হতে পারত। কিন্তু ১৯ জুলাই ছুটির দিনের ঘটনায় খামারবাড়ির এত সংখ্যক কর্মকর্তাকে জড়ানো উদ্দেশ্যমূলক। মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান বলেন, মামলার বাদির ছেলে আহত হয়েছেন, এটা নিশ্চিত। কিন্তু আসামিদের কারা দোষী আর কারা দোষী নন, সেটা তদন্ত করার পরই জানা যাবে।
মাঠে নজরদারি কম : প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো তথ্য বলছে, গত আগস্টে আকস্মিক বন্যায় দেশের ২৩ জেলায় এবং সেপ্টেম্বরে ১৩ জেলার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩৫ জেলায় মোট ৪ লাখ ৭৮ হাজার ১৩৭ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ ২ লাখ ৯০ হাজার ৮০৪ হেক্টর। ফসল উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ ১০ লাখ ৭০ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রায় ১৮ লাখ কৃষক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য প্রায় ২০৬ কোটি টাকা কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। প্রায় ১৬ লাখ পরিবারকে চাষাবাদে বিনামূল্যে সার, বীজ/চারা ও নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু মাঠে কৃষক এসব প্রণোদনা ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না তা নিয়ে মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত বন্যা বা যেকোনো দুর্যোগ হলে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের ঘুম থাকে না। দিনরাত মাঠে ছুটে বেড়ান। কিন্তু এবারের বন্যায় এত বড় ক্ষতির পরও সেভাবে কর্মকর্তাদের দেখা যায়নি।
এ দিকে আসন্ন বোরো মৌসুমে সার সঙ্কট হবে কিন া তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত সারের সঙ্কট নেই। জিটুজি পদ্ধতিতে সার আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু সময়মতো সার না এলে আসন্ন বোরো ধান, সরিষাসহ অন্যান্য ফসল আবাদে সমস্যায় পড়বেন কৃষক। প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ে পাঠানো কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিগত সরকারের রেখে যাওয়া আমদানিকৃত সারের বকেয়া পরিশোধ ও এলসি ওপেনিং সচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ফলে বর্তমানে সার আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে কৃষি খাতের তথ্য বলছে, মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৭টি দফতর/ সংস্থার মধ্যে ১০টি দফতর/সংস্থার প্রধান পদে নতুন কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পদে পদোন্নতির কথাও বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ডিএই, ব্রি, বারি, বিএডিসি, বিএআরসি, বিজেআরআই, এআইএসসহ বিভিন্ন দফতর/সংস্থায় প্রধান হিসেবে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই আবার বিগত সরকারের সুবিধাভোগী, অনেকে আবার সরাসরি স্বৈরশাসকের অনুসারী। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই আগের মতোই বঞ্চিতরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ আসছে। খামারবাড়ির কৃষি কর্মকর্তাদের নামে মামলা প্রসঙ্গে কৃষি সচিব ড. মুহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, মামলা হয়েছে জেনেছি। কেন এভাবে মামলা হলো সেটা দেখা দরকার। মনে হয়েছে, এটা (মামলা) উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর আগে খামারবাড়ির গেটে কর্মকর্তাদের ছবি টানানোর বিষয়ে সচিব বলেন, ডিএইর ডিজির কাছে জানতে চেয়েছি যে কারা ছবি টানিয়েছিল। আর মন্ত্রণালয় থেকেও এটা দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ছাইফুল আলমকে কয়েকবার ফোন দিয়ে ও ম্যাসেজ দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এবার ৭৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা
কৃষিতে তিন মাসেও ফেরেনি শৃঙ্খলা
- খামারবাড়িতে কর্মকর্তাদের মধ্যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা - মাঠে নজরদারি কম, উৎপাদন ব্যাহতের শঙ্কা- সামাল দিতে রাতেও অফিস করছেন সচিবস্বৈরশাসকের পতন হয়েছে তিন মাসের বেশি হলো।...



