- যমুনা সেতুর টোল আদায়
- সরকারের ক্ষতি ৩৮ কোটি টাকা

যমুনা সেতুর টোল আদায়ে ব্যবহারের জন্য সফটওয়্যারটি কিনলে খরচ হতো সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। অথচ সেই সফটওয়্যারটি না কিনে শুধুমাত্র সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আশীর্বাদপুষ্ট কোম্পানি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম লিমিটেডকে সিএনএস বাড়তি সুবিধা দিতেই তাদের সাথে ভাড়ায় চুক্তি করা হয়। ১০ মাসের সেই ভাড়ার চুক্তি ধাপে ধাপে গিয়ে ঠেকে ৮৯ মাসে। সেতু বিভাগের কারসাজিতে এতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে সরকারকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আইন অনুযায়ী এ ধরনের ক্রয় সংক্রান্ত বা ভাড়ার ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আশীর্বাদপুষ্ট সিএনএসকে বিশেষ সুবিধা দিতেই সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ইচ্ছাতেই বিনা দরপত্রে কাজটি দেয়া হয়। সূত্র আরো বলছে, সিএনএস কোম্পানির লাইসেন্সটি রয়েছে কানাডা প্রবাসী মুনীর উজ্জমান চৌধুরীর নামে। আর সেতু ভবনের সবাই জানতেন এটা সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রতিষ্ঠান। তার ছোটভাই আরিফুল হক এই কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত। তার মৃত্যুর পর আনিসুল হকই এটার দেখভাল করতেন।

যদিও সব বিধি মেনেই সিএনএস কাজ পেয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জিয়াউল আহসান সরোয়ার। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা নিয়ে কাজ পায়নি। আরিফুল হক যিনি ছিলেন তিনি আমাদের অফিসে চাকরি করতেন, এই অফিসের কনসালট্যান্ট ছিলেন তিনি। ২০১৬ তে তিনি আমেরিকায় চলে যান এবং ২০১৭ সালে তিনি মারা যান। আর আমাদের সাথে সরকারের চুক্তি হয় ২০১৭ সালের এপ্রিলে ১০ মাসের জন্য। সেটা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়।
যমুনা সেতু দেশের উত্তরাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রবেশপথ হওয়ায় ১৯৯৮ সালে উদ্বোধনের পর থেকেই গাড়ির চাপ ছিল প্রচুর। সেতুতে দিনে পারাপার হয় ১৮ থেকে ১৯ হাজার গাড়ি, গড় টোল আদায় এক কোটি ৭০ থেকে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। ঈদে যা ছাড়িয়ে যায় তিন কোটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরুতে ঠিকাদার দিয়ে ঠিকঠাক মতো টোল আদায় হলেও জটিলতা দেখা দেয় ২০১৬ থেকে। ওই সময় মামলা সংক্রান্ত এক জটিলতার কারণে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া যাচ্ছিল না। আর এ কারণে সেতু বিভাগ নিজস্ব জনবল দিয়ে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য সেতু বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল ওই সময় কাজটির পরিচালনার বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিদেশও সফর করেন।

এদিকে নিজেরা টোল আদায়ের কাজটি না পাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে সিএনএস তাদের সফটওয়্যারটি গছিয়ে দেয় সেতু বিভাগকে। এ বিষয়ে তাদের সাথে সেতু বিভাগের ১০ মাসের একটি চুক্তি হয় ২০১৭ সালের এপ্রিলে। সেতু বিভাগের ওই চুক্তিতে সিএনএসের পক্ষে সইও করেন পরিচালক ইকরাম ইকবাল। কিন্তু সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ইচ্ছায় ওই ১০ মাসের চুক্তিকে দফায় দফায় বাড়িয়ে নেয়া হয় গত আগস্টে আওয়ামী সরকার পতন পর্যন্ত। হিসেব বলছে, ৮৯ মাসে ভাড়া বাবদ সেতু বিভাগের কাছ থেকে সিএনএস প্রায় ৩৮ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। অথচ এক মাসের ভাড়ার চেয়েও কম খরচে সফটওয়্যারটি কেনা সম্ভব ছিল বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। যমুনা সেতুর সাবেক ঠিকাদার মোবারক হোসেন বলেন, সফটওয়্যারটা আমরা বানিয়েছি। আমরা সফটওয়্যার সম্পর্কে অভিজ্ঞ। এই সফটওয়্যার বানাতে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা লাগে। যমুনা সেতুতে ব্যবহৃত সফটওয়্যারটি তৈরি করতে ব্যয়ের বিষয়টি জানতে চাইলে এড়িয়ে যান সিএনএসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জিয়াউল আহসান। তিনি বলেন, যমুনা সেতুতে টোল আদায়ে আমরা যে সফটওয়্যার ব্যবহার করেছি তা তৈরি করা হয়েছে দুই বছর গবেষণা করে। আমাদের কোম্পানিতে ২০০ সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ কাজ করেন। এটা তাদের গবেষণার ফসল।

সেতু বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো: ফেরদৌস নয়া দিগন্তকে বলেন, সফটওয়্যারটি কেনার জন্য মনে হয় ১২০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। যে কারণে এটা ভাড়াতে আসা হয়। তা ছাড়া এটা পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত জনবল আমাদের নেই। সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, নতুন সফটওয়্যার নিজেরা তৈরির জন্য একটা প্রক্রিয়া চলছে। কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিলে আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব। তিনি বলেন, অনেকেই অনেক কথা বলেন, তবে বাস্তবচিত্র ভিন্ন। আমরাতো টোল আদায় বন্ধ রাখতে পারি না। টোল আদায়ের সুবিধার্থে সিএনএসের সাথে ভাড়ায় চুক্তি করা হয়েছিল। এখন নতুন কোম্পানি টোল আদায় করছে।