চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন কবি হেলাল হাফিজ। ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ অমর এ পঙ্ক্তির রচয়িতা এই কবির লাশ গতকাল রাজধানীর শাহবাগ সুপার হোম হোস্টেল থেকে উদ্ধার করা হয়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা: মো: রেজাউর রহমান জানান, বেলা ৩টার দিকে হেলাল হাফিজ যে হোস্টেলে থাকতেন, সেখানকার লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। তখন তিনি মৃত ছিলেন।
জীবদ্দশায় তার মাত্র দুইটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ রাজনৈতিক ভাষা আর আবেগের মিশেলে প্রকাশের পরপরই তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত বইটির বৈধ মুদ্রণই হয়েছে ৩৩ বারের বেশি। রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে তার কবিতার পঙ্তি যেমন ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি আশির দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক প্রতিচ্ছবি বলা হয় তার কবিতাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় তার লেখা ওই কবিতার প্রথম দুইটি লাইন ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়; এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,’ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয় এবং এখনো পর্যন্ত এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহৃত রাজনৈতিক স্লোগান। তিনি ছিলেন প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতন, কিন্তু চরিত্রে ছিলেন বোহেমিয়ান। বিয়েও কনেননি কখনো। জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন তোপখানা রোড আর সেগুনবাগিচার আবাসিক হোটেলে। রোজ খেতে যেতেন জাতীয় প্রেস ক্লাবে। তিনি সাংবাদিক ও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করেছেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক যুগান্তরে কর্মরত ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে খুব শান্ত আর অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ ছিলেন।
কবি হেলাল হাফিজ ছিলেন দ্রোহ আর প্রেমের কবি। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ দিয়েই মানুষের হৃদয়ে আসন করে নেন হেলাল হাফিজ। এত কম কবিতা লিখে এত খ্যাতি পাওয়ার নজির বাংলাদেশের সাহিত্যে নেই। লড়াইয়ে, সংগ্রামে, প্রেমে-বিরহে, দ্রোহে যাপিত জীবনের পরতে পরতে তিনি স্পর্শ দিয়েছেন। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র মতো ‘অগ্ন্যুৎসব’ কবিতাও শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগুন জ্বেলে দেয়। কেবল মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের মতো প্রেক্ষাপটে নয়, যেকোনো অন্যায়ে-শোষণে-অবিচারে হেলাল হাফিজের এ উচ্চারণ সবার হয়ে ওঠে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থভুক্ত প্রতিটি কবিতার শেষে উল্লেখিত তারিখ অনুযায়ী কবিতাগুলো লেখা হয়েছে ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন, এর মধ্যে ২০১৩ সালে তিনি কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। তার দ্বিতীয় এবং শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে।

কবি হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা খোরশেদ আলী তালুকদার পেশায় ছিলেন স্কুলশিক্ষক আর মা কোকিলা বেগম গৃহিণী।
বাংলাদেশ কংগ্রেসের শোক : দেশবরেণ্য কবি ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য হেলাল হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাজি রেজাউল হোসেন ও মহাসচিব অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম। এক শোক বার্তায় নেতারা বলেন, সৃষ্টিশীল এই ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান নেতারা।
আজ নামাজে জানাজা : মরহুমের নামাজে জানাজা আজ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি হাসান হাফিজ ও সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া কবি হেলাল হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।